গ্রুপটির নাম ছিল ‘Fifa World Cup 2026’। বাইরে থেকে সাধারণ একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ হলেও এটি এখন বড় ইস্যু। ভারতের বহুল আলোচিত নিটের প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারির তদন্তে এই গ্রুপই হয়ে ওঠে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। আট শিক্ষার্থীকে নিয়ে গঠিত ওই গ্রুপের মাধ্যমে প্রশ্ন সরবরাহ, বিশেষ ক্লাস পরিচালনা এবং পরীক্ষার প্রস্তুতির আড়ালে চলছিল প্রশ্নপত্র ফাঁসের পরিকল্পনা। প্রায় ২০ হাজার পৃষ্ঠার চার্জশিটে এমনই বিস্ফোরক তথ্য তুলে ধরেছে ভারতের সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই)।
দিল্লির একটি আদালতে চলতি মাসের শুরুতে দাখিল করা চার্জশিটে সিবিআই জানিয়েছে, ওই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের সূত্র ধরেই প্রধান দুই অভিযুক্ত পি ভি কুলকার্নি ও মনীষা মান্ধারেকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়। একই সঙ্গে উন্মোচিত হয় পুরো ‘প্রশ্নপত্র ফাঁসের ষড়যন্ত্রের’ কৌশল।
সিবিআই জানায়, দুইজন নিট পরীক্ষার্থীর জবানবন্দির ভিত্তিতে জানা যায়, পুনের বাসিন্দা মনীষা মান্ধারে ২০২৫ সালের নভেম্বরে ‘Fifa World Cup 2026’ নামে আট সদস্যের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ তৈরি করেন। এই গ্রুপে জীববিজ্ঞানের বিশেষ ক্লাসের সমন্বয়, ক্লাসের সময়সূচি, পরীক্ষার পর প্রশ্ন মূল্যায়ন এবং নম্বর গণনা নিয়ে আলোচনা হতো।
তদন্তে উঠে এসেছে, পুনের এক বিউটিশিয়ান মনীষা ওয়াঘমারে এই চক্রে ‘ফ্যাসিলিটেটর’ হিসেবে কাজ করতেন। তিনি শিক্ষার্থীদের ওই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত করতেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা করতেন।
সিবিআইর দাবি, তিনি শিক্ষার্থীদের বলতেন, ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির (এনটিএ) জন্য প্রশ্নপত্র অনুবাদ ও প্রুফরিডিংয়ে যুক্ত বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে পরিচালিত এসব ক্লাসে অংশ নিলে তারা নিট পরীক্ষায় হুবহু একই প্রশ্ন পাবে।
চার্জশিট অনুযায়ী, জীববিজ্ঞানের ক্লাসে অভিযুক্ত মনীষা মান্ধারে শিক্ষার্থীদের নতুন একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির এনসিইআরটি বইয়ের নির্দিষ্ট অনুচ্ছেদ চিহ্নিত করতে বলতেন। পাশাপাশি বইয়ের পাশে নির্দিষ্ট কিছু প্রশ্ন লিখে রাখতে নির্দেশ দিতেন। ক্লাস শেষে শিক্ষার্থীরা সেসব প্রশ্ন আলাদা খাতায় লিখে আনলে মান্ধারে তা সংশোধন করে দিতেন।
সিবিআই জানায়, ২০২৫ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর এবং ২০২৬ সালের মার্চ-এপ্রিল—এই দুই সময়ে পুনের গঙ্গা ওসিয়ান এলাকায় নিজের বাসায় জীববিজ্ঞানের বিশেষ রিভিশন ক্লাস নিতেন তিনি।
তদন্তে আরও জানা যায়, ওয়াঘমারের মাধ্যমে আসা একই শিক্ষার্থীরা রসায়নের বিশেষজ্ঞ পি ভি কুলকার্নির ক্লাসেও অংশ নিত। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে পুনের নান্দেড সিটি এলাকায় নিজের বাসায় কুলকার্নি দুই ব্যাচে মোট নয়জন শিক্ষার্থীকে বিশেষ ক্লাস করান। সেখানে তিনি পরীক্ষায় আসা একই রসায়নের প্রশ্ন সরবরাহ করেন বলে অভিযোগ।
এছাড়া ‘NEET 2026’ নামে আরেকটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে তিনি পরীক্ষার আগে ক্লাসের সময়সূচি ও অনলাইন লিংক শেয়ার করতেন।
সিবিআই বলেছে, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের এক সদস্যের জবানবন্দি অনুযায়ী, মনীষা মান্ধারের দেওয়া জীববিজ্ঞানের প্রশ্ন এবং পি ভি কুলকার্নির দেওয়া রসায়নের প্রশ্ন ২০২৬ সালের নিটের পরীক্ষার আসল প্রশ্নের সঙ্গে মিলে যায়। এই তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে গত ১৫ মে কুলকার্নি এবং ১৬ মে মনীষা মান্ধারেকে গ্রেফতার করা হয়।
চার্জশিটে বলা হয়েছে, মনীষা মান্ধারে নিটের পরীক্ষার জন্য এনটিএর বোটানি ও জুলজি বিষয়ের বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।
প্রশ্নপত্র তৈরির বিভিন্ন ধাপে তার গোপন পরীক্ষাসামগ্রীতে প্রবেশাধিকার ছিল। কিন্তু গোপনীয়তা রক্ষার বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজের বাসায় কোচিং করাতেন এবং আট শিক্ষার্থীকে নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ পরিচালনা করতেন।
তদন্তে পরে পদার্থবিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞ মনীষা হাভালদারের সম্পৃক্ততার তথ্যও সামনে আসে। অর্থের বিনিময়ে তিনি ওয়াঘমারের মাধ্যমে আনা শিক্ষার্থীদের কাছে হাতে লেখা ৬৬টি পদার্থবিজ্ঞানের প্রশ্ন ফাঁস করেছিলেন বলে অভিযোগ। পরে তাকেও গ্রেফতার করা হয়।
সিবিআই জানিয়েছে, মনীষা ওয়াঘমারের স্বামীর পুনের ডেন্টাল ক্লিনিকই বিভিন্ন বিষয়ের ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র সমন্বয় ও প্রক্রিয়াকরণের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
সাক্ষীদের জবানবন্দিতে নিশ্চিত হওয়া গেছে, ওই ক্লিনিকেই প্রশ্ন টাইপ করার কাজ চলত। এছাড়া ওয়াঘমারের কাছ থেকে উদ্ধার করা ডিজিটাল তথ্য-প্রমাণে দেখা গেছে, জীববিজ্ঞান, রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানের ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র সংরক্ষণ, আদান-প্রদান এবং প্রচারে তিনি সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন বলে দাবি করেছে সিবিআই।
সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস
Leave a Reply