মেহেদী হাছান মাহীম:
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে বাংলাদেশের চলমান ঋণ কর্মসূচির ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ ছাড়ের জট কাটার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। নির্ধারিত শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় এত দিন কিস্তি ছাড়ের বিষয়টি ঝুলে ছিল। গত বছরের ডিসেম্বরে ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ পাওয়ার কথা থাকলেও এখনো তা পায়নি বাংলাদেশ। অন্তর্বর্তী সরকার ও আইএমএফ—উভয় পক্ষই চেয়েছিল নির্বাচিত সরকারের সময় এ বিষয়ে সমাধান হোক। সেই জটই এবার কাটতে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ ছাড়ের আগে কিছু শর্ত পূরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ছাড় দিতে পারে আইএমএফ। বিশেষ করে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে প্রতিবছর শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ হারে অতিরিক্ত কর আদায়ের শর্তে কিছুটা নমনীয়তা দেখানো হতে পারে। এর পরিবর্তে তুলনামূলক সহজ ও নমনীয় কিছু নতুন শর্ত যুক্ত হতে পারে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
কিস্তি ছাড় ও শর্ত পূরণের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে ঢাকায় এসেছেন আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন। নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন তিনি। বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গেও পৃথক বৈঠক করেন কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন। এ সময় আইএমএফের গবেষণা বিভাগের উন্নয়ন সামষ্টিক অর্থনীতি শাখার প্রধান ক্রিস পাপাজর্জিও এবং সংস্থাটির আবাসিক প্রতিনিধি ম্যাক্সিম ক্রিশকো উপস্থিত ছিলেন।
আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ কর্মসূচি শুরু হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে, ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি। পরবর্তী সময়ে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের জুনে আরও ৮০ কোটি ডলার যোগ হয়ে কর্মসূচির মোট আকার দাঁড়ায় ৫৫০ কোটি ডলারে। এরই মধ্যে পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ পেয়েছে ৩৬৪ কোটি ডলার। এখনো বাকি রয়েছে ১৮৬ কোটি ডলার।
এর বাইরে আইএমএফের কাছ থেকে আরও অর্থ সহায়তা চাওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। আগামী মাসের মাঝামাঝি ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠেয় বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।
আইএমএফের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে আজ সাংবাদিকদের অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘ঋণ কর্মসূচির বিপরীতে যেসব শর্ত রয়েছে, সেগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতির পরিপ্রেক্ষিতে ক্রমান্বয়ে বাস্তবায়ন করা হবে। সব একসঙ্গে করা যাবে না, আমরা আমাদের মতো করে করব।’
আগামী জুনের মধ্যে ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ ছাড় হবে কি না এবং আইএমএফের কাছে বাড়তি সহায়তা চাওয়া হবে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী মাসে ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।
আগামী ১৩ থেকে ১৮ এপ্রিল ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠেয় ওই বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদল অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এতে অর্থমন্ত্রী ছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, অর্থসচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অংশ নেবেন বলে জানা গেছে।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বসন্তকালীন বৈঠক শেষে ঢাকায় আইএমএফের আরও একটি মিশন আসবে। ওই মিশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্তের জন্য বিষয়টি আইএমএফের পরিচালনা পর্ষদে উপস্থাপন করা হবে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জুন মাসের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে ষষ্ঠ কিস্তি ছাড়ের প্রস্তাব উপস্থাপনের অনুরোধ জানানো হয়েছে। তবে আইএমএফের কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, জুনে সম্ভব না হলে জুলাই মাসে বিষয়টি পরিচালনা পর্ষদে তোলা হতে পারে।
Leave a Reply