টানা ১৬ বছর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পলায়নের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হয় আওয়ামী লীগ। লুটপাটকারী দলটির নেতাকর্মীরা যে যার মতো করে সেকেন্ড হোমে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে, হয়েছে বিপুল মামলাও। এরই মধ্যে নানান ইস্যুতে দেশে বসে এবং বিদেশ থেকে প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে আওয়ামী লীগের নেতা এবং তাদের বিদেশি সমর্থকরা। এই বিষয়কে কেন্দ্র করে ঢাকায় অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। সব পক্ষকেই দিয়েছেন বার্তা।
বুধ ও বৃহস্পতিবারের (৪ ও ৫ ডিসেম্বর) বৈঠক থেকে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা হারানো আওয়ামী লীগ এবং ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে দুটি বার্তা দিয়েছে। যা হলো- দেশের সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদার প্রশ্নে সরকার আপসহীন এবং ফ্যাসিবাদ হটাতে গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া সব পক্ষ তাদের প্রতিহত করতে এখনো লেগে আছে।
তথ্যসূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামে আইনজীবী হত্যা, বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীকে গ্রেফতার ও তার জামিন না হওয়া, ভারতীয় গণমাধ্যমে উসকানিমূলক নানা অপপ্রচার এবং আগরতলায় বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হামলা এবং জাতীয় পতাকার অবমাননাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি অনেকটাই ঘোলাটে। যে কারণে দেশের পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতেই সব পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেছে ইউনূস সরকার। এই বৈঠকে সব পক্ষকে একত্র থাকার আহ্বানও জানানো হয়েছে।
এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে চলমান বিভিন্ন ঘটনার জেরে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে। কোন কোন স্থানে সহিংসতার চিত্রও দেখা গেছে। এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজনৈতিক দল, সংগঠনসহ বিভিন্ন ধর্মের নেতাদের নিয়ে বুধবার (৪ ডিসেম্বর) বাংলাদেশ ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে বৈঠক করেছেন ড. ইউনূস। সেদিন ৩৫টির বেশি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা দেশের স্বাধীনতা ও মর্যাদার প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ থাকার ঘোষণা দেন। আওয়ামী লীগ ও তাদের সমর্থকদের; বিশেষ করে যারা দেশের পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে চায় তাদের প্রতিহত করতে একত্র থাকার আহ্বান জানানো হয়।
বৈঠকে অংশ নেওয়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এর পরিষ্কার বার্তা দেওয়া হয়েছে যে আমরা ঐক্যবদ্ধ। সংখ্যালঘুদের নিয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার হচ্ছে, ষড়যন্ত্রের গন্ধও পাচ্ছি। এটা মোকাবিলার জন্য এই সময়ে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকা উচিত। এ পরিস্থিতিতে পতিত স্বৈরাচারী গোষ্ঠী ও দল এবং তাদের সমর্থকেরা ছাড়া সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের প্রতিহত করতে প্রস্তুত আছে।’
অন্যদিকে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন ইস্যুকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী দেশ ভারতও তাদের গণমাধ্যমে উস্কানিমূলক প্রচারণা চালাচ্ছে। এতে দুই দেশের মধ্যে প্রভাব এবং উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস বৃহস্পতিবার (৫ ডিসেম্বর) ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গেও আলোচনায় বসেন। এই বৈঠকেও সবাই ঐক্যবদ্ধ থেকে সব পরিস্থিতি মোকাবিলা করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
এ প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকে বিএনপি নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ধর্মকে ব্যবহার করে দেশে বিভক্তি সৃষ্টির পেছনে বাইরের শক্তির প্রভাব, দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা প্রশ্নবিদ্ধ করার মতো ঘটনা এভাবে অতীতে কখনো ঘটেনি। এ ধরনের পরিস্থিতিতে দেশের স্বাধীন অস্তিত্বের প্রশ্নে জাতীয় ঐক্য থাকতে হয়, এ বৈঠকে সেটিই হয়েছে। সংলাপে জাতীয় ঐক্যের একটা প্রকাশ ঘটেছে।
এছাড়াও দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতি ও ভারতীয় প্রচারণা নিয়ে গণমাধ্যমে কথা বলেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, ভারতের যে মিথ্যা প্রচারণা, বাংলাদেশবিরোধী কর্মকাণ্ড, এর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগীরা ছাড়া জাতি যে ঐক্যবদ্ধ আছে, এই বার্তা দেশে এবং বহির্বিশ্বে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন ছিল। সে বার্তাটি গেছে। একই সঙ্গে এই সংলাপে বিভিন্ন বিষয়ে যে প্রস্তাব এসেছে, যেমন সবাই মিলে একটি সমাবেশ করা, পলিটিক্যাল কাউন্সিল করা, জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল করা- এগুলো বিবেচনার অবকাশ সৃষ্টি হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ভারতকে বুঝতে হবে, বাংলাদেশের মানুষ আর নতজানু নীতি মেনে নেবে না, আমরা সম-অধিকার ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব চাই।
Leave a Reply