সাদ্দাম হোসাইন, বিশেষ প্রতিনিধিঃ
মাত্র ৪৫ বছর বয়সেই চট্টগ্রামের আলফাতুন নেসার জীবনে নেমে আসে ভয়াবহ বিপর্যয়। দুটি কিডনি বিকল হয়ে যাওয়ায় ২০২২ সালের জুন থেকে তাঁকে প্রতি সপ্তাহে দুইবার ডায়ালাইসিস নিতে হয়েছে। কিন্তু অবস্থার অবনতি ঘটায় ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় সপ্তাহে তিনবার। গত তিন বছরে চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে বসতবাড়ি ছাড়া প্রায় সব সম্পত্তিই বিক্রি করতে হয়েছে তাঁকে। অর্থাভাবে কিডনি প্রতিস্থাপন এখনো অধরা। আলফাতুন নেসার মতো অসংখ্য মানুষের জীবনসংগ্রাম এখন বাংলাদেশের এক কঠিন বাস্তবতা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে (সিকেডি) আক্রান্ত বেশির ভাগ রোগীর পরিবার চিকিৎসা করাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সপ্তাহে তিনবার ডায়ালাইসিস করতে হলে মাসে প্রায় ৪৫ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। কিডনি প্রতিস্থাপনের পরও দীর্ঘমেয়াদে ব্যয়বহুল ওষুধ চালিয়ে যাওয়া অনেক রোগীর পক্ষেই সম্ভব হয় না। তাই এসব রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যবিমা চালুর ওপর জোর দিচ্ছেন তাঁরা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ আকস্মিক কিডনি বিকল রোগে আক্রান্ত হয়, যার ৮৫ শতাংশই উন্নয়নশীল দেশে। কিডনি অ্যাওয়ারনেস মনিটরিং অ্যান্ড প্রিভেনশন সোসাইটির তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ১৬ থেকে ১৮ শতাংশ মানুষ দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত। একবার কিডনি বিকল হলে বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় হয় ডায়ালাইসিস অথবা কিডনি প্রতিস্থাপন, কিন্তু ব্যয়বহুল হওয়ার কারণে প্রায় ৯০ শতাংশ রোগীই পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাবে মারা যান।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের ইউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মিজানুর রহমান বলেন, অনেক ক্ষেত্রে ডায়ালাইসিস নেওয়ার সময় রোগীরা তাঁদের হেপাটাইটিস বি ও সি সংক্রমণের তথ্য গোপন করেন। এসব রোগীর জন্য আলাদা ডায়ালাইসিস মেশিন থাকলেও সেখানে সিরিয়াল পেতে দেরি হয়। আবার অনেক সেন্টারে নিয়মিত পরীক্ষা না হওয়ায় এই ভাইরাসগুলো অন্য রোগীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
একই প্রতিষ্ঠানের ইউরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এম এ সামাদ বলেন, জটিল কিডনি রোগ এড়াতে হলে আগে থেকেই সতর্ক হতে হবে। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা, নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম খাদ্য গ্রহণ, ওজন নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান পরিহার এবং পর্যাপ্ত পানি পান অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় ব্যথানাশক ওষুধ এড়িয়ে চলতে হবে এবং ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের নিয়মিত পরীক্ষা করাতে হবে।
জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. বাবরুল আলম বলেন, দেশে কিডনি প্রতিস্থাপন নিয়মিত হলেও আইনি জটিলতা ও অঙ্গদানের অভাবে সেই হার খুব কম। সরকারি পর্যায়ে ডায়ালাইসিস সেবাও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। তিনি মনে করেন, কিডনি রোগীদের টিকিয়ে রাখতে স্বাস্থ্যবিমা চালু করা অত্যন্ত জরুরি, নইলে এই ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া অধিকাংশ রোগীর পক্ষেই অসম্ভব হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশে কিডনি চিকিৎসা ব্যবস্থায় রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। দেশে কিডনি প্রতিস্থাপন বিশেষজ্ঞ মাত্র ১৫ জন এবং সরকারি পর্যায়ে ডায়ালাইসিস শয্যা রয়েছে মাত্র ৩৬০টি। বেশির ভাগ জেলা শহরে এই সুবিধা না থাকায় রোগীদের দূরদূরান্তে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হয়, যা তাদের কষ্ট ও ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেয়।
সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের অভিমত স্পষ্ট—প্রতিরোধমূলক সচেতনতা বাড়ানো, চিকিৎসা অবকাঠামো উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্যবিমা চালু ছাড়া কিডনি রোগীদের এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
Leave a Reply