সাজিদ রাজু
গোলাম রব্বানি নাদিম। জামালপুর জেলার স্থানীয় সাংবাদিক। তার সঙ্গে আমার কখনো দেখা হয়নি, কথা হয়নি, কখনো পরিচয় ছিলো না। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যে পরিচয় ঘটলো তাতেও কখনো আর কথা হবে না।
জামালপুর গেলে সেখানকার কয়েকজন ভাই-বেরদর সাংবাদিকের সঙ্গে কথা হয়, আলাপ হয়। সবার সঙ্গে হয় না। আবার আমার উপজেলা সরিষাবাড়ি গেলেও কিছু পরিচিত সাংবাদিক ভাইয়ের সঙ্গে আলাপ হয়।
আলাপটা কী নিয়ে হয়? আলাপের বেশিরভাগ অংশজুড়েই থাকে সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ নিয়ে। বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে সাংবাদিকরা কতোটা অনিরাপত্তার মধ্যে কাজ করে তা নিয়ে আলাপ হয়। মফস্বলের সেই সাংবাদিক বন্ধুরা অনেকে হতাশা প্রকাশ করেন।
হতাশার মূল কারণ ২টা। প্রথমত তারা কাজ করেন প্রায় বিনা বেতনে। কোন রকমে একটা পরিচয়পত্র থাকে পত্রিকাওয়ালাদের কাছ থেকে। সেটাই তাদের পরিচয়। সেই পরিচয়েই গ্রাম থেকে গ্রামাঞ্চল চষে বেড়াতে হয়। গ্রামে সাংবাদিকদের প্রধান বাহন মোটর সাইকেল। সবার আবার সেটা থাকেও না। যাতায়াতের যে ব্যয় সেটা যেহেতু পত্রিকা অফিস থেকে বহন করা হয়না তাই তাদের নানাভাবে এই খরচের টাকা তুলতে হয়। এতেই তাদের বেশিরভাগ জড়িয়ে পড়ে নানা অনৈতিক উপায়।
গ্রামে সাংবাদিক ভাইদের অনেককে দেখি এজন্য তারা ক্ষমতাসীনদের কাছাকাছি থাকেন। কিছু উপরি কামাই হয়। খরচের টাকা ওঠে, দিন শেষে ঘর সংসার কোন রকমে সামাল দেওয়া যায়। অনেকের আর্থিক অবস্থা বেশ ভালই হয়। তবে এই গ্রুপ আবার ক্ষমতাসীন তোষণের কারণে দালাল সাংবাদিক হিসেবে পরিচিতি পান। কোন কোন সাংবাদিককে আমার এলাকায় দেখি ক্ষমতাসীন নেতাদের নানা কাজেকর্মে থাকেন। মাউথপিস হিসেবে ব্যবহৃত হন। তাদের আগে-পিছে, নানা অপকর্মেও যুক্ত থাকেন। খবর কতোটা লেখেন বা না লেখেন, যে কোন অনুষ্ঠানে তাদের সরব উপস্থিতি থাকে। তবে এই শ্রেণি থেকে সাধারন মানুষ খুব একটা উপকার পান না। বিশেষ করে কোথাও কোন ঘটনা-দুর্ঘটনা ঘটলেই একটা গ্রুপ করে দাপটের সাথে চলে যান, কিছু পয়সা বগলদাবা করে ফিরে আসেন। তবে নিউজ করেন ক্ষমতাসীনের পিঠ বাঁচিয়ে।
দ্বিতীয়ত, যারা এই ক্ষমতা তোষণে নজর না দিয়ে পেশাদারিত্ব ধরে রেখে চলার চেষ্টা করেন, তাদের চলতে হয় কোন রকমে। পান থেকে চুন খসলেই স্থানীয় প্রভাবশালীদের কুনজরে পড়ার আশঙ্কা থাকে। পেশার খাতিরেই কোন ভাবে ক্ষমতা বা প্রভাবের বিরুদ্ধে গেলে মেলে হুমকি ধামকি। কখনো কখনো শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনও সইতে হয়। জীবন দিয়ে সেটা যারা প্রমাণ করেন তাদেরই একজন গোলাম রব্বানী নাদিম।
এই যে সাংবাদিকদের মধ্যে নানা গ্রুপিং, সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাংবাদিকের অবস্থান এতে লাভবান হয় কারা? সোজা উত্তর, ক্ষমতাশালীরা। ক্ষতিগ্রস্ত হয় কারা? আরও সোজা উত্তর, সাধারণ মানুষ। সাধারণ মানুষের হয়ে তাদের স্বার্থ রক্ষা করতে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার যে অসাধ্য সাধন করেন সাংবাদিকরা, তাদের জীবন নাশে চূড়ান্ত ক্ষতি হয় দেশের।
নাদিম হত্যার অভিযোগ যার বিরুদ্ধে সেই ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান গ্রেফতার হয়েছেন। তাকে ক্ষমতাসীন দল থেকে সাময়িক বহিস্কার করা হয়েছে। কিন্তু নাদিমের মৃত্যুর পর। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেই যে সুষ্ঠূ বিচার হবে, তাতেও নাদিমের কোন লাভ হবে না। ভুগতে হবে নাদিমের পরিবারকে। আর এই ঘটনায় বাকি ক্ষমতার কুমিরেরা চোখ রাঙাবে অন্য কোন নাদিমকে। এর অবসান দরকার, অতি দ্রুত।
লেখক: সাংবাদিক।
Leave a Reply