যুক্তরাষ্ট্র একটি শক্তিশালী চুক্তি নিশ্চিত করবে, নতুবা ইরানের সঙ্গে “অন্য পথে” মোকাবিলা করবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি এ মন্তব্য করেন এমন সময়, যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করার কোনো চুক্তি খুব শিগগিরই হচ্ছে—এমন প্রত্যাশা এখনই না রাখার জন্য। আলজাজিরার প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
সোমবার (২৫ মে) নয়াদিল্লিতে রুবিও বলেন, “আমরা ভেবেছিলাম গত রাত বা আজ কিছু খবর আসতে পারে। তবে এতে খুব বেশি কিছু ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।” তিনি ইঙ্গিত দেন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ বন্ধে সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে, যা শুরু হয়েছে ২৮ ফেব্রুয়ারি।
তিনি আরও বলেন, “আমাদের কাছে একটি মোটামুটি শক্তিশালী প্রস্তাব আছে, যেখানে তাদের (ইরানের) জন্য প্রণালীগুলো (স্ট্রেইটস) খুলে দেওয়া এবং নৌপথ সচল করার বিষয় রয়েছে।”
তিনি জানান, ওয়াশিংটন ও তেহরান ৮ এপ্রিল থেকে যুদ্ধবিরতি মেনে চলছে, যদিও মধ্যস্থতাকারীরা সমঝোতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে ইরান এখনো হরমুজ প্রণালী দিয়ে বেশিরভাগ জাহাজ চলাচল বন্ধ করে রেখেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলো অবরোধ করেছে।
রবিবার ট্রাম্প ট্রুথ সোশালে লেখেন, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ “সম্পূর্ণভাবে বহাল থাকবে, যতক্ষণ না একটি চুক্তি চূড়ান্ত, অনুমোদিত এবং স্বাক্ষরিত হয়।”
তিনি আরও বলেন, “উভয় পক্ষকে সময় নিতে হবে এবং সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে।”
অন্যদিকে, সোমবার তেহরানে এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার অনেক বিষয়ে “চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে”, তবে এর অর্থ এই নয় যে চুক্তি খুব শিগগিরই স্বাক্ষরিত হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে দুই দেশের আলোচনায় পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে সরাসরি কথা হচ্ছে না; বরং মূল ফোকাস যুদ্ধ বন্ধ করা।
বাঘাই সতর্ক করে বলেন, সম্ভাব্য কোনো চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রতিশ্রুতি রাখবে কি না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই এবং তেহরান কোনো হুমকিকে গুরুত্ব দেয় না।
তিনি এসব মন্তব্য করেন রুবিওর সেই বক্তব্যের পর, যেখানে তিনি বলেন—যুক্তরাষ্ট্র হয় একটি “ভালো চুক্তি করবে”, নয়তো “অন্য পথে” যাবে।
রুবিও বলেন, “আমরা হয় একটি ভালো চুক্তি পাব, নয়তো অন্যভাবে বিষয়টি সামলাতে হবে। আমরা অবশ্যই ভালো চুক্তি চাই।”
এদিকে কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের কর্মকর্তারা সোমবার চীনে অবস্থান করেন। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির ও প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বেইজিংয়ে চীনা নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
চীন জানিয়েছে, তারা পাকিস্তানের সঙ্গে মিলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কাজ করবে।
মুনির গত সপ্তাহে তেহরান সফরও করেন, যেখানে তিনি সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতার অংশ নেন।
চুক্তি নিয়ে অগ্রগতির ইঙ্গিতের মধ্যে এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেন, আলোচনায় এখন মূল যে বিষয়গুলো রয়েছে তার সর্বশেষ রূপরেখা তৈরি হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, ইরান নীতিগতভাবে তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে ফেলা এবং হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে, বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র নৌ-অবরোধ তুলে নেবে।
তিনি আরও দাবি করেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনি এই চুক্তির মূল কাঠামো সমর্থন করেছেন।
তবে এ বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।
মার্কিন কর্মকর্তা আরও বলেন, প্রথম ধাপে প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া এবং নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে, এরপর পারমাণবিক বিষয়গুলো ধাপে ধাপে সমাধান করা হবে।
তিনি বলেন, “ইস্যুটা ইরান সম্মত হয়েছে কি না, তা নয়; বরং কীভাবে হবে, সেটাই প্রশ্ন।”
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনের সিনিয়র ফেলো চার্লস কাপচান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই টানাপোড়েন দেখে বোঝা যায়, শিগগিরই কোনো চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।
তার মতে, “ট্রাম্প প্রশাসনের ক্ষেত্রে এটা অনেকটা স্বাভাবিক। একদিন একদিকে যায়, পরদিন অন্যদিকে।”
তিনি আরও বলেন, “আলোচনার কিছু অংশ গোপন, কিছু অংশ প্রকাশ্য কূটনীতি। তবে যতক্ষণ না স্পষ্ট হয় ইরান উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম ছাড়তে এবং হরমুজ প্রণালী শর্ত ছাড়া খুলে দিতে রাজি—ততক্ষণ বলা যাবে না যে চূড়ান্ত চুক্তি কাছাকাছি।”
Leave a Reply