যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সমর্থিত একটি বিলাসবহুল রিসোর্ট প্রকল্পের বিরুদ্ধে আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় হাজারো মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। এটি এ প্রকল্পবিরোধী এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ কর্মসূচি। আলজাজিরার প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বুধবার বিক্ষোভকারীরা “আলবেনিয়া বিক্রির জন্য নয়” লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এদি রামার কার্যালয়ের সামনে জড়ো হন। তারা “নতুন আলবেনিয়া” স্লোগান দিতে থাকেন। বিক্ষোভকারীদের দীর্ঘ মিছিল শহরের প্রধান একটি সড়কজুড়ে প্রায় আধা মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।
প্রায় ৫ বিলিয়ন ইউরো (৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার) ব্যয়ে নির্মিতব্য এই রিসোর্ট প্রকল্পটি দেশটিতে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কারণ, এটি এমন একটি সংরক্ষিত জলাভূমির পাশে নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যেখানে ফ্লেমিঙ্গো, সিল এবং সামুদ্রিক কচ্ছপের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল রয়েছে।
সমালোচকদের অভিযোগ, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পরিকল্পিত এ প্রকল্পের বিষয়ে যথেষ্ট স্বচ্ছতা নেই। পাশাপাশি পরিবেশগত ঝুঁকিও যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি।
বিক্ষোভকারী লিয়ান্ড লাকরোরি রয়টার্সকে বলেন, “গত ৩৫ বছর ধরে আলবেনিয়ায় যা ঘটছে, এই প্রকল্প তারই একটি বড় উদাহরণ। আজ আমরা বলতে চাই—আর নয়।”
দক্ষিণ উপকূলীয় গ্রাম জভারনেক থেকে শুরু হওয়া এ আন্দোলনের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ফ্লেমিঙ্গো বিপ্লব’। কারণ, রিসোর্ট নির্মাণের জন্য নির্ধারিত এলাকাটি পরিযায়ী ফ্লেমিঙ্গো পাখির গুরুত্বপূর্ণ আবাস ও বিশ্রামস্থল হিসেবে পরিচিত।
তবে পরিবেশগত উদ্বেগকে গুরুত্বহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী এদি রামা। তিনি বলেছেন, প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করা হবে এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা মেনেই কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে।
রামা বলেন, “আলবেনিয়ার বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে আমরা যা করেছি, তা নিয়ে আমরা গর্বিত। প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী সুরক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ইউরোপীয় কমিশনের সন্দেহ করার কোনো কারণ নেই।”
এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) আলবেনিয়াকে সতর্ক করে বলেছে, ইউরোপীয় পরিবেশ আইন ও মানদণ্ড মেনে চলা দেশটির সম্ভাব্য ইইউ সদস্যপদের অন্যতম শর্ত।
ইইউ মুখপাত্র গিয়োম মার্সিয়ে বলেন, “আলবেনিয়ার উচিত এমন কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া, যা সদস্যপদের শর্ত পূরণের পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। আমরা আশা করি, দেশটির কর্তৃপক্ষ দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।”
ইইউ জানিয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে আলবেনিয়াসহ কয়েকটি বলকান দেশকে সদস্যপদ দেওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে।
এই বিক্ষোভ প্রধানমন্ত্রী রামার জন্য নতুন একটি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০১৩ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা রামার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমনে ব্যর্থতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক খাতগুলোর উন্নয়নে যথেষ্ট উদ্যোগ না নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
রামা অবশ্য দাবি করেছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই জোরদার করতে তিনি বিশেষ প্রসিকিউশন অফিস গঠন করেছেন, যা ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি আলোচিত তদন্ত শুরু করেছে।
তবুও জনগণের অসন্তোষ কমেনি। চলতি বছরের শুরুতে দুর্নীতির অভিযোগে উপপ্রধানমন্ত্রী বেলিন্দা বাল্লুকুর পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ হয়। পরে রামা তাকে বরখাস্ত করলেও সরকারের প্রতি জনঅবিশ্বাস এখনও রয়ে গেছে।
বিক্ষোভকারী ফাবিও ব্রাকাই বলেন, “আমি এখানে এসেছি এই রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান দেখতে। বারবার একই দুটি দল ক্ষমতায় আসে। আমরা নতুন একটি যুগ চাই, আমরা আরও ভালো একটি দেশ চাই।”
এই রিসোর্ট প্রকল্পের উদ্যোক্তা জ্যারেড কুশনার ও তার স্ত্রী ইভাঙ্কা ট্রাম্প। কয়েক বছর আগে ইয়টে ভ্রমণের সময় আলবেনিয়ায় এসে তারা দেশটির প্রেমে পড়েছিলেন বলে জানিয়েছেন।
গত মাসে প্রকল্প এলাকায় ঘিরে বেড়া নির্মাণের পর বিরোধিতা আরও তীব্র হয়। জনরোষের মুখে পরে সেই বেড়া সরিয়ে নেওয়া হয়।
তবে প্রধানমন্ত্রী রামা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, সব সমালোচনা ও প্রতিবাদ সত্ত্বেও প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।
Leave a Reply