হু হু করে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। চলতি সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম ১০ দিনেই আক্রান্তের সংখ্যা পৌঁছেছে ১২ হাজার ৫৮৪ জনে। এই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ৪২ জন রোগীর। অথচ গত আগস্ট মাসে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন ২০ হাজার ৫৩৬ জন। পুরো মাসে প্রাণ হারিয়েছেন ৪৩ জন। এমন পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু হঠাৎ কেন এমন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে সেই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সবার মনে।
বাংলাদেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিনিয়ত গবেষণা করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশারের নেতৃত্বাধীন একটি গবেষক দল। এই কীটতত্ত্ববিদের দাবি, সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর এমন ভয়াবহ বিস্তারের আশঙ্কা দুই মাস আগেই আঁচ করতে পেরেছিলেন তারা। বিষয়টি জানানো হয়েছিল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেও।
অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বাংলাভিশনকে বলেন, ডেঙ্গুর এই বিস্তার হঠাৎ করে নয়। বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ব্রুটো ইনডেক্স দেখে আমরা আগেই বলেছি, মশার যে ঘনত্ব দেখা যাচ্ছে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে ডেঙ্গু ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। শুধু ঢাকায় নয়, এবার দেশের বিভিন্ন স্থানে ডেঙ্গু মহামারী আকার ধারণ করবে বলেও আশঙ্কার রয়েছে। এই দুই মাসে ৪০ হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে পারে বলেও আমরা আগেই বলেছি।
বিশেষজ্ঞদের এই সতর্কতার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কতটা প্রস্তুত ছিল নগর প্রশাসন। প্রশ্ন ছিল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রি. জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরীর কাছে।
তিনি সংবাদমাধ্যমে বলেন, এবার পূর্বাভাস পেয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শেই আমরা ডেঙ্গুর হটস্পটগুলো চিহ্নিত করার কাজ করেছি। আমরা ইপিআই কর্মীদের কাজে লাগিয়ে প্রতিদিন ঢাকার দশটি হাসপাতালে ভর্তি হওয়া প্রতিটি রোগীর ডাটাবেইজ তৈরি করেছি। অ্যাপসের মাধ্যমে তৈরি এই ডাটাবেইজ ধরে আমরা ঢাকার ১০০টি ডেঙ্গুর হটস্পট চিহ্নিত করেছি। রোগির ঠিকানা ধরে পরদিনই আমরা সেই ঠিকানার লার্বার খোঁজে টিম নামিয়েছি। এছাড়া ১০০টি হটস্পটে আগামী শনিবার থেকে পরিচ্ছন্নতা অভিযানে নামবে আমাদের প্রশিক্ষিত সাড়ে ৩০০ স্বেচ্ছাসেবী কর্মী। এই কাজ চলবে আগামী ১০০ দিন ধরে।
তিনি বলেন, আমরা আশাবাদী রোগীর হটস্পট ধরে ধরে লার্ভা নিধন করা গেলে খুব দ্রুত ডেঙ্গুর বিস্তার আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবো।
এদিকে চিকিৎসকরা বলছেন, সংক্রমণ বাড়ার এই সময়ে শুধু সরকার বা প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে না থেকে ব্যক্তিগত সতর্কতার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে। জ্বর বা ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলেই দ্রুত নিতে হবে চিকিৎসকের পরামর্শ।
এ বিষয়ে শ্যামলী ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট টিবি হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার বলেন, গত ২ দশকের বেশি সময় ধরে ডেঙ্গুর সঙ্গে আমাদের বসবাস। প্রথমে ডেঙ্গু ঢাকায় দেখা গেলেও এখন মোটামুটি সারাদেশেই ছড়িয়েছে। একটা ভাইরাস এক জায়গায় দীর্ঘদিন থাকলে তার আচরণের অনেক পরিবর্তন হয়। ডেঙ্গুও তার ব্যতিক্রম নয়। এখন ডেঙ্গুর আচরণগত অনেক পরিবর্তন আসতে পারে। হয়তো ডেঙ্গু আক্রান্ত কিন্তু জ্বর কম এসেছে দেখে আপনি গুরুত্ব দিচ্ছেন না। কিন্তু এই অবহেলাই আপনাকে ঝুঁকির দিকে নিয়ে যেতে পারে। তাই জ্বর হলেই ডাক্তারের কাছে যাওয়া এবং টেস্ট করা খুবই জরুরি। তাছাড়া, ক্রিটিক্যাল অবস্থায় পৌঁছানোর আগেই হাসপাতালে আসা উচিত।
ডেঙ্গুতে পানিশূন্যতা ঠেকাতে ওরস্যালাইন, পর্যাপ্ত তরল এবং পানিসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণেরও পরামর্শ দিয়েছেন এই চিকিৎসক।
Leave a Reply