সংবিধান অনুযায়ী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর কয়েক মাস বাকি। তবে নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার আগেই উত্তপ্ত রাজপথ। নিজেদের শক্তির জানান দিতে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও মাঠের বিরোধী দল বিএনপি ‘পালটাপালটি’ কর্মসূচি পালন করে চলেছে। ইতোমধ্যে শেষ বার্তা দিয়েছে দুদলই। শেখ হাসিনাই নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করবেন বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে বিএনপি বলছে, সরকারকে পদত্যাগ করে নিরপেক্ষ-নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে। পূজার ছুটির মধ্যে পদত্যাগ করে ‘সেফ এক্সিট’ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে দলটি হুঁশিয়ারিও দিয়েছে। অন্যথায় ২৮ অক্টোবর ঢাকার মহাসমাবেশ থেকে সরকার পতনে লাগাতার কর্মসূচি দেওয়া হবে। এদিন আওয়ামী লীগ ঢাকায় বড় শোডাউন করবে বলে দলের নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন। তার আগে বিরোধীদের মহাসমাবেশ ঘিরে সরকারি নানা পরিকল্পনাও রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। যদিও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা বলে আসছেন, বিরোধীরা আন্দোলন করলে তাদের কোনো বাধা দেয়া হবে না। মানুষের জানমালের ক্ষতি করার চেষ্টা করা হলে তা প্রতিহত করা হবে।
২০০৬ সালের ২৮শে অক্টোবর দেশের রাজনীতি সংঘাতময় এক দিন পার করেছিল। বিভিন্ন সংবাদপত্রের তথ্য অনুযায়ী ওই দিন ঢাকাসহ সারা দেশে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল সহিংসতায়। তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের শেষদিন ছিল ২৮শে অক্টোবর। এদিন ঢাকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশ ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। পল্টনে আওয়ামী লীগ ও জামায়াত কর্মীদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে অন্তত ৪ জনের মৃত্যুর খবর দিয়েছিল বিভিন্ন পত্রিকা। ওই দিন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা লগি-বৈঠা নিয়ে সংঘর্ষে জড়ান। জামায়াতের নেতাকর্মীরাও কাঠের লাঠি নিয়ে মারমুখী অবস্থানে ছিলেন। দুই পক্ষের সংঘর্ষে বিস্ফোরণ এবং গুলির ঘটনাও ছিল। মূলত ওই দিনের সংঘাতের সূত্র ধরেই দেশে এক এগারোর প্লট তৈরি হয়। ওই ঘটনার ১৭ বছর পর আবার একই তারিখে ঢাকায় রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচি ঘিরে উত্তাপ উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।
এ দিনের কর্মসূচি সফল করতে বিএনপি’র সমমনা দল ও জোটের পক্ষ থেকেও ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া যুগপৎ আন্দোলনের বাইরে থাকা জামায়াতে ইসলামীও এদিন কর্মসূচি দিয়ে মাঠে থাকতে পারে। কারণ ২০০৬ সালের ২৮শে অক্টোবর দলটির নেতাকর্মীদের হত্যার প্রতিবাদে প্রতিবছরই এ দিন নানা কর্মসূচি পালন করে থাকে দলটি। এবার ভিন্ন প্রেক্ষাপটে জামায়াত বৃহৎ কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকতে পারে। এ ছাড়া একই দিন কর্মসূচি দিতে পারে আরেক ইসলামী দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। আজ দলটির ছাত্র ও যুব সমাবেশ রয়েছে। এ সমাবেশ থেকে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম বলেন, বিএনপি একেক সময় একেক দফা দিচ্ছে। আবার খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য ৪৮ ঘণ্টা আলটিমেটাম দিয়েছিল। এসব তাদের নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করার জন্যই বলা। আমরা আবারও বলছি, সংবিধান অনুযায়ীই আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই প্রধানমন্ত্রী থাকবেন। তিনি আরও বলেন, আমাদের কর্মসূচি আছে, থাকবে। রাজপথে ছিলাম, থাকব। কোনোরকম নৈরাজ্য হলে তা মোকাবিলা করব।
এদিকে দুই প্রধান রাজনৈতিক শিবিরের পালটাপালটি অবস্থানে উদ্বেগ ছড়ালেও সমঝোতার আশা হারাচ্ছেন না রাজনীতি পর্যবেক্ষকরা। তারা মনে করেন, দলগুলোর অনড় অবস্থান সাধারণ নাগরিকদের শঙ্কিত করে তুলছে। তবে অনড় অবস্থানের প্রকাশ ঘটলেও এখানেই শেষ ভাবা ঠিক হবে না। দুদলকেই স্বউদ্যোগী হয়ে জনগণের কথা ভেবে আলোচনা করতে হবে, সমঝোতায় আসতে হবে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা ক্ষমতাসীন দলের। দুদলই গোঁ ধরে রাখলে এ ইমিচ্যুরিটির জন্য মাশুল দিতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচনের আগে একেবারে সংঘাত হয়নি তা বলা মুশকিল। তবে দেখা দরকার তফশিল ঘোষণা যখন হবে বিএনপি নির্বাচনে যাবে কিনা। বিএনপি নির্বাচনে গেলে এক ধরনের রাজনীতি, না গেলে অন্য ধরনের রাজনীতি হবে। যদিও তার কিছু আভাস পাওয়া যাচ্ছে, নির্বাচনে না গেলে কী হতে পারে। তবে এখন আন্তর্জাতিক কমিউনিটি যার ওপর ভর করে কথা বলছিল, তারা তো সে ধরনের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা এখন বলছেন না। বলছে, সংবিধান পরিবর্তন তাদের দায়িত্ব নয়। সব মিলিয়ে আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশে সমঝোতা তখনই হয় যখন জনগণ চায়। রাজধানীতে ৩০-৪০ হাজার লোক হলো সে নিয়ে তো দেশের রাজনীতি কখনো পরিবর্তন হয়নি। লাখ লাখ জনগণ দেশজুড়ে যখন বড় আকারে দাবি করবে, তখন পরিবর্তন হবে।
Leave a Reply