বিয়ের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় এক ছাত্রীকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে সাইদুল ইসলাম নামে এক মাদ্রাসা শিক্ষকের বিরুদ্ধে। পরিবারের বরাত দিয়ে র্যাব বলছে, বিয়ের প্রস্তাবে ছাত্রীর পরিবার রাজি না হওয়ায় তাকে হত্যা করেন ওই শিক্ষক। গত ৮ মে রাতে গাজীপুরের সালনা এলাকায় এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। এই ঘটনায় নিহত ছাত্রীর বাবা বাদী হয়ে গাজীপুর সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। বৃহস্পতিবার (১১ মে) রাজধানীর কাওরান বাজারের র্যাব মিডিয়া সেন্টারে এই সংক্রান্ত এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানান সংস্থাটির আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।
র্যাব কমান্ডার জানান, ওই মাদ্রাসা শিক্ষক হাউজ টিউটর হিসেবে গাজীপুরের সালনায় এক পরিবারের মা ও তিন মেয়েকে আরবি পড়ান প্রায় ৬ মাস যাবত। এক পর্যায়ে তাদের বড় মেয়ের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলে বিয়ের প্রস্তাব দেন তিনি। কিন্তু পরিবার মেনে না নেওয়ায় মেয়েকে হত্যার পরিকল্পনা করে সাইদুল। আর পরিকল্পনা অনুযায়ী সুযোগ বুঝে মেয়ের বাসায় গিয়ে এলোপাথাড়ি কুপিয়ে বড় মেয়েকে ঘটনাস্থলে খুন করেন। মেয়েকে বাঁচাতে এসে রক্তাক্ত জখম হন মা ও ছোট দুই মেয়ে। তারা বর্তমানে মূমুর্ষ অবস্থায় আইসিউতে ভর্তি রয়েছেন।
খন্দকার আল মঈন আরও জানান, গাজীপুরের সালনায় গৃহশিক্ষক কর্তৃক নৃশংসভাবে কুপিয়ে কলেজ ছাত্রীকে হত্যা এবং নিহতের মা ও ২ বোনকে মারাত্মকভাবে জখম করার ঘটনার একমাত্র আসামি মো সাইদুল ইসলামকে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর থেকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাবের একটি টিম।
র্যাব জানায়, বুধবার (২৪ মে) দিবাগত রাতে র্যাব সদর দফতরের গোয়েন্দা শাখা ও র্যাব-১-এর একটি আভিযানিক দল টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর এলাকা থেকে মো. সাইদুল ইসলাম গ্রেপ্তার করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের কথা সাইদুল স্বীকার করেছেন। ।
সাইদুলকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে কমান্ডার আল মঈন বলেন, ২০২০ সালে করোনাকালীন সময়ে নিহত ওই ছাত্রীর পরিবারের সবাইকে আরবি পড়ানোর জন্য গৃহশিক্ষক হিসেবে ছাত্রীর বাবা তাকে নিয়োগ করেন। আরবি পড়ানোর সুবাদে তিনি প্রতিনিয়ত ছাত্রীর বাসায় যাওয়া-আসা করতেন। একপর্যায়ে ছাত্রীর পরিবারের সঙ্গে তার সু-সম্পর্ক তৈরি হয়। একপর্যায়ে ছাত্রীকে তিনি বিয়ের প্রস্তাব দেন। বিষয়টি পরিবার জানতে পেরে ৫-৬ মাস আরবি শেখানোর পর পড়ানো বন্ধ করে দেয়।
আল মঈন আরও জানান, পরবর্তী সময়ে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ওই ছাত্রীকে সাইদুল মৌখিকভাবে বিবাহ করেন। পরে সাইদুল বিয়ের বিষয়টিকে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ওই ছাত্রী ও তার পরিবারকে চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। ছাত্রীর পরিবার সাইদুলের অসৎ উদ্দেশ্য টের পেয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। এরপর ২০২২ সালের অক্টোবরে ছাত্রী গাজীপুর সদর থানায় বিভিন্ন সময়ে তাকে উত্যক্ত করার বিষয়ে একটি অভিযোগ দাখিল করেন। এতে সাইদুল কিছুদিন উত্যক্ত করা হতে বিরত থাকেন। কিন্তু গত ২ মাস যাবৎ ওই ছাত্রীর কলেজে এবং বাসার বাহিরে যাওয়া-আসার পথে পুনরায় তাকে উত্যক্ত করতে থাকেন। বিয়ের প্রস্তাবে রাজি না হলে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেন।
র্যাব কমান্ডার বলেন, একপর্যায়ে সাইদুল জানতে পারেন, ওই ছাত্রীর পরিবার তাকে উচ্চ শিক্ষার জন্য দেশের বাইরে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিষয়টি সাইদুল কোনোভাবেই মেনে নিতে না পেরে ছাত্রী ও তার পরিবারের প্রতি ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।
সংবাদ সম্মেলনে র্যাব কমান্ডার আরও জানান, ছাত্রীকে হত্যার পূর্বপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য গত ৭ মে বিকালে স্থানীয় বাজারে কামারের দোকানে ৬৫০ টাকা দিয়ে গরু জবাই করার একটি ছুরি তৈরি করতে দেন। পর দিন ৮ মে সন্ধ্যায় ছুরি সংগ্রহ করে ছাত্রীর বাসায় গিয়ে তার রুমে ঢুকে ধারালো ছুরি দিয়ে মাথায়, গলায়, হাতে ও পায়ে উপর্যুপুরি ছুরিকাঘাত করেন। এ সময় ছাত্রীর চিৎকারে তার মা ও দুই বোন দৌড়ে তার ঘরে গিয়ে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করলে সাইদুল ছুরি দিয়ে তাদেরও এলোপাথাড়িভাবে কুপিয় জখম করে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। তাদের চিৎকারে স্থানীয় লোকজন এসে ঘটনাস্থল থেকে সবাইকে উদ্ধার করে শহীদ তাজউদ্দিন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক ওই ছাত্রীকে মৃত ঘোষণা করেন। ছাত্রীর মা ও ছোট ২ বোনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাদের শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে তাদের উত্তরার একটি হাপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে ছাত্রীর মা আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছেন বলে জানায় র্যাব।
আল মঈন জানান, নিহত ওই ছাত্রী ২০২০ সালে জয়দেবপুরের একটি কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরবর্তী সময় গাজীপুরের চৌরাস্তার একটি কলেজে স্মাতক দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যায়নরত ছিলেন। পড়ালেখার পাশাপাশি স্থানীয় একটি বিউটি প্রোডাক্টস অনলাইন শপে চাকরি করতেন। এছাড়া তাকে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্যে দেশের বাইরে যাওয়ার জন্য কিছুদিন আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ভিসাসহ আনুষঙ্গিক নথিপত্র প্রস্তুত করেছিল পরিবার।
এই র্যাব কমান্ডার আরও জানান, সাইদুল চট্টগ্রামের একটি মাদ্রাসা থেকে দাওরা পাস করেন। তিনি গাজীপুরের একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করার পাশাপাশি স্থানীয় একটি মসজিদে ইমামতি করতেন। এলাকার বিভিন্ন বাসায় গিয়ে প্রাইভেট পড়াতেন। তিনি ২ মাস আগে দুটি চাকরিই ছেড়ে দেন। ঘটনার পর থেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দেওয়ার জন্য নিজের চেহারা পরিবর্তন করে টাঙ্গাইলের ভূঞাঁপুরে তার এক বন্ধুর বাসায় আত্মগোপনে যান। পরে আত্মগোপনে থাকাকালীন সময়ে বুধবার রাতে র্যাব তাকে গ্রেপ্তার করে।
Leave a Reply