দ্বীপ জেলা ভোলা থেকে জীবিকার টানে ঢাকায় এসে রিকশা চালান আব্দুল ওহাব। চার বছর ধরে চলছে তাঁর রিকশার পেডেল। প্রতিদিনের মতো গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে রিকশা নিয়ে বের হন তিনি। তীব্র রোদে ঘেমে একাকার ওহাব দুপুরে থামেন মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের ফুটপাতে একটি খাবার দোকানের সামনে। রান্না করা ডিম আর ভাত খেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দাম শুনেই যেন আঁতকে উঠলেন। দুই প্লেট ভাত আর ডিমের দাম ৬০ টাকা। বাধ্য হয়ে পাঁচমিশালি সবজি দিয়ে ভাত খেলেন।
মাস ছয়েক আগে পাইকারি দোকান থেকে মুরগির ভাঙা ডিম কিনতেন আসাদুল ইসলাম। নির্মাণ শ্রমিক আসাদুল দুই ছেলে-মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে থাকেন রাজধানীর একটি বস্তিতে। ইদানীং তিনি ভাঙা ডিমও কিনতে পারেন না। চার-পাঁচ টাকার ভাঙা ডিম এখন ৮ থেকে ৯ টাকায় বিক্রি হয়। দীর্ঘশ্বাস নিয়ে আসাদুল বলেন, ‘হামরা গরিব মানুষ বাহে, এলা ডিম কিনে খাবার মুরদ নাই। ডিমের দাম দেখি-হামার ছোলপোলগুলোও এখন ডিম খাবার চায় না।’
লাগামছাড়া দামের কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ মাছ-মাংস খাওয়া আগেই কমিয়ে দিয়েছেন। প্রাণিজ আমিষ বলতে ডিমই ছিল তাঁদের ভরসা। এখন ডিমের দামও ঊর্ধ্বমুখী। প্রতি ডজন ডিমের দাম ১৭০ টাকা। তাতে নিম্ন আয় ও শ্রমজীবী মানুষ ডিম খাওয়াও কমাতে শুরু করেছেন।এ পরিস্থিতি আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব ডিম দিবস। ১৯৯৬ সালে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় আন্তর্জাতিক এগ কমিশনের কনফারেন্সে প্রতিবছর অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার ডিম দিবস পালনের সিদ্ধান্ত হয়। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য– ‘ডিমে পুষ্টি ডিমে শক্তি, ডিমে আছে রোগ মুক্তি’। ডিমের পুষ্টি নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে আজ সারাদেশে র্যালি ও সেমিনারের আয়োজন করেছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর মালিবাগ, মোহাম্মদপুর, খিলগাঁও ও রামপুরা এলাকার একাধিক নিম্ন আয়ের মানুষ বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠান সচেতনতা বাড়ানোর কর্মসূচি নিলেও দাম নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখছে না। ফলে ডিম খেতে গিয়ে তারা হিমশিম খাচ্ছেন।
মালিবাগের চা বিক্রেতা সাখাওয়াত হোসেন বলেন, দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন শুধু ছোট ছেলের জন্য ডিম কেনেন। আগে প্রত্যেকে একটি করে খেতেন। এখন এক ডিম ভাগ করে খান। মোহাম্মদপুরের সাদিয়া হোটেলের ম্যানেজার আতিকুর রহমান বলেন, তাদের হোটেলে আগে প্রতিদিন গড়ে ১০০টি ডিম বিক্রি হতো। এখন ৪০-৫০টি বিক্রি হয়। কারখানার শ্রমিক ও রিকশাচালকরা ডিম বেশি খেতেন। এখন শাক, ভর্তা আর ডাল দিয়ে খেয়ে চলে যান।পুষ্টিবিদ তামান্না চৌধুরী বলছেন, কেউ যদি মাছ-মাংসের পরিবর্তে প্রতিদিন ডিম খান, তাহলেও প্রোটিনের চাহিদা পূরণ হবে। ডিমে ৬ গ্রামের মতো প্রোটিন থাকে। নিম্নবিত্তের মানুষ প্রতিদিন মাছ-মাংস পান না। তাদের প্রোটিনের চাহিদা ডিম পূরণ করে। ইদানীং দাম বেড়ে যাওয়ায় পুষ্টি ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
ইব্রাহিম জেনারেল হাসপাতালের উপপ্রধান পুষ্টি কর্মকর্তা ফারজানা আনজিন বলেন, মূল্য বৃদ্ধির কারণে ডিম খাওয়া কমিয়ে দেওয়াটা উদ্বেগজনক। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে তা বড় ধরনের পুষ্টি ঘাটতির কারণ হবে। মানুষের চিকিৎসা ব্যয় বাড়বে।
ডিম বাজারের হালচাল
বেশ লম্বা সময় ধরেই ডিমের বাজারে অস্থিরতা চলছে। গত আগস্টে এক ডজন ডিমের দাম ১৪৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৮০ টাকা পর্যন্ত হয়েছিল। কারণ হিসেবে ‘সিন্ডিকেটের’ মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণকে দায়ী করা হয়। গত ১৪ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রথমবারের মতো প্রতিটি ডিমের মূল্য ১২ টাকা নির্ধারণ করে দেয়।
গত মাসে তিন দফায় ১৫ কোটি ডিম আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়। এ পর্যন্ত আমদানির কোনো ডিম দেশে আসেনি। দর বেঁধে দেওয়ার এক মাস পরও বাজারে তা কার্যকর করা যায়নি। খুচরা বাজারে প্রতিটি ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৪ টাকায়।
সূত্র: সমকাল
Leave a Reply