সাদ্দাম হোসাইন, বিশেষ প্রতিনিধি:
বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। উপকূলীয় অঞ্চল, নদীবিধৌত চরাঞ্চল কিংবা হাওর—সব জায়গাতেই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার কারণে প্রতি বছর লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নারী ও শিশুরা। তবে নারীরা কেবল ভুক্তভোগীই নন, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তারা হয়ে উঠেছেন এক অদৃশ্য শক্তি। গ্রামীণ জীবিকা, দুর্যোগ মোকাবিলা, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও সমাজে সচেতনতা তৈরিতে নারীর অবদান আজ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
দেশের উপকূলী অঞ্চলগুলোতে জলবায়ুর অব্যাহত আঘাতে বিপর্যস্ত হয়ে এখন নারীরাও ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কথা ধরা যাক। ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’ ও ‘আইলা’তে বিপর্যস্ত হওয়া এ অঞ্চলের নারীরা এখন ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সক্রিয় সদস্য। তারা আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া থেকে শুরু করে আশ্রয়কেন্দ্রে শিশু ও প্রবীণদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরাসরি কাজ করছেন।
৫০ বছর বয়সী স্বেচ্ছাসেবী জাহানারা বেগম বলেন, “আগে আমরা শুধু ঘরে বসে কাঁদতাম, কী হবে জানতাম না। এখন আমরা নিজেরাই মানুষকে নিরাপদে নিতে সাহায্য করি। আশ্রয়কেন্দ্রে পানি, খাবার ও স্বাস্থ্যসেবার জন্য নারীরাই প্রথম উদ্যোগ নেই।”
অন্যদিকে- জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় জমিতে লবণাক্ততা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তবে এ অবস্থায়ও নারীরা নতুন পথ খুঁজে নিয়েছেন। সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার গৃহীনি সালমা খাতুন আগে স্বামীকে ধানচাষে সহযোগিতা করতেন। কিন্তু গেল বছরগুলেতে লবণাক্ত পানির কারণে ধান নষ্ট হয়ে যায়। ফলে মেলে না কাঙ্খিত ফসল। এতে ভীষণভাবে প্রভাব পড়ে সংসারে।
সালমার সংসারে আর্থিক ধৈন্যতা কাটাতে স্থানীয় একটি এনজিওর সহায়তায় তিনি ‘বেগুন ও টমেটো ভাসমান চাষ’ শুরু করলেন। প্রথমবারই উচ্চ ফলনে হাসি ফুটেছে সালমার স্বামী ও সংসারে। এখন তার উৎপাদিত সবজি শুধু নিজের পরিবারই নয়, বাজারেও বিক্রি হচ্ছে। আয় হচ্ছে অর্থ।
সালমা খাতুন বলেন—
“আমরা যদি হার মানতাম, তাহলে পরিবার না খেয়ে থাকত। আমি যখন দেখলাম- ধান ধাষের চেয়েও এই সবজি চাষে আর্থিক লাভ বেশি, তখন অন্য নারীরাও আমার কাছ থেকে শিখছে। আমিও নারীদেরও শিখিয়েছি ভাসমান চাষ। এখন অন্তত আয় আছে, বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাতে পারছি।”
এদিকে- জলবায়ুর প্রভাবে শুধু ঝড়-জলোচ্ছ্বাস কিংবা লবনাক্ত পানিই নয়, বরং আরও কঠিন বিপর্যয় আনছে নদীভাঙন। এতে মাইলের পর মাইল কৃষি জমি নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে কৃষিজীবী মানুষ ও তাদের সংসারকে চরম দুঃচিন্তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এতে চরম ভুক্তভোগীও হচ্ছে নারী ও শিশুরা। তবে সব হারানো নারীরাও এখন বিকল্প জীবিকা গড়ে তুলছেন। নোয়াখালীর হাতিয়ার বয়ারচরে বসবাসরত রোকসানা বেগম নদীভাঙনে জমি হারিয়ে খালি হাতে স্বামী ও তিন সন্তান নিয়ে পড়েছিলেন বিপদে। মাথা গোঁজার ঠাঁই করার মতো অর্থও তার ছিল না। হাতিয়ার সুখচর ইউনিয়ন থেকে নদী ভেঙে তিনি পড়ি জমান বয়ারচরে। এখানে স্থায়ীদের আর্থিক সহায়তায় বেড়ির ধারে ঠাঁই নিলেন। কিন্তু স্বামীর একার সামান্য আয়ে সংসারে শান্তি ফেরানো তো দূরের কথা। তিনবেলা সন্তানদেরকেই খাবার দিতে পারছিলেন না। পরে স্থানীয় একটি এনজিও’র কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে হাঁস-মুরগি পালন শুরু করলেন। এরপরই স্বামীর আয়ের পাশাপাশি নিজেরও আয় আসতে থাকে। বর্তমানে তিনি মাসে গড়ে ৬ থেকে ১০ হাজার টাকা হাঁস-মুরগি ও ডিম বিক্রি করে আয় করেন।
রোকসানা বলেন, “আমার স্বামী- বাইরে কাজ খুঁজতে যায়। আমরা নারীরাও পিছিয়ে নেই। হাঁস-মুরগি, ছাগল পালন করে সংসার চালাই। এই আয়ের টাকায় ঘর সামলাই, ছেলেমেয়েকে পড়াই।”
শুধু রোকসানা কিংবা জাহানারা বেগমরা নয়। জলবায়ুর বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হাজারো নারী আজ ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। যার ফলে দেশে জলবায়ুর প্রভাব মোকাবেলায় বাড়ছে সচেতনতা।
এদিকে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় গ্রামীণ পর্যায়ে নারীরা নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারেও ভূমিকা রাখছেন। বরিশালের মেহেরুন্নেছা পলি একটি সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট বসিয়ে ঘরে বিদ্যুৎ এনেছেন। শুধু তাই নয়, প্রতিবেশী নারীদেরও সৌরবিদ্যুতের সুবিধা নিতে উদ্বুদ্ধ করছেন।
এছাড়া যশোরের নাজমা খাতুন বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন করে রান্নার জ্বালানি ও সার হিসেবে ব্যবহার করছেন। এতে পরিবেশ রক্ষা হচ্ছে, আবার অর্থ সাশ্রয়ও হচ্ছে। এভাবে নারীরা জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় উদ্যোক্তাও হচ্ছেন আবার সবুজ প্রযুক্তি ব্যবহারে রাষ্ট্রে ভূমিকাও রাখছেন।

অন্যদিকে- হাওর অঞ্চলের তানিসা চৌধুরী নামের নারী শিক্ষক প্রতি সপ্তাহে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক ক্লাস নেন। তিনি শিশুদের শেখান কীভাবে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করতে হয়, বৃক্ষরোপণের উপকারিতা কী, কিংবা বন্যার সময় কীভাবে নিরাপদ থাকতে হবে।
তার মতে—
“শিশুদের যদি সচেতন করা যায়, তারা পরিবারকে প্রভাবিত করবে। আর পরিবারকে প্রভাবিত করলে পুরো সমাজেই পরিবর্তন আসবে।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন- জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় নারীদেরকে বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতন করলে এবং প্রশিক্ষণ দিলে তাদের শক্তি কাজে লাগানো যাবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপিক ড. মাহবুবা নাসরিন বলেন “জলবায়ু পরিবর্তনে নারীই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে তাদের শক্তিকে কাজে লাগানো গেলে তারা টেকসই সমাধানের অংশ হতে পারে। নীতি ও পরিকল্পনায় নারীকে কেন্দ্রীয় ভূমিকা দিতে হবে।”
তবে এসব ইতিবাচক পরিবর্তনের মাঝেও বড় কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।বিশেষজ্ঞরা মনে করেন- নারীরা অনেক সময় স্থানীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জায়গা পান না। আবারও প্রশিক্ষণ ও অর্থনৈতিক সহায়তারও অভাব আছে।সামাজিক বাঁধা ও লিঙ্গ বৈষম্যের কারণেও নারী নেতৃত্ব সীমিত থাকে। তবে এসব সমস্যা ধীরে ধীরে কেটে গেল সত্যিকার্থে নারীরা জলবায়ুর প্রভাব মোকাবেলায় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপস ও সমাজ গবেষক তৌহিদুল হক বলেন- ”বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়, বরং বর্তমানের বাস্তবতা। এই বাস্তবতায় নারী শুধু ভুক্তভোগী নন, বরং সমাধানের অংশীদার। তারা গ্রামীণ জীবিকা, কৃষি উদ্ভাবন, বিকল্প কর্মসংস্থান, সবুজ প্রযুক্তি ও সামাজিক সচেতনতা তৈরিতে অসাধারণ ভূমিকা রাখছেন।”
তার মতে- রাষ্ট্রীয় নীতি ও আন্তর্জাতিক সহায়তায় নারীর অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নারীর এই অদৃশ্য শক্তি দৃশ্যমান হলে—বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে বলে মনে করেন তিনি।
Leave a Reply