সাদ্দাম হোসাইন, বিশেষ প্রতিনিধি:
ঘনবসতিপূর্ণ দরিদ্র এলাকাগুলোতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়্যাল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) এক নীরব মহামারি হিসেবে ছড়িয়ে পড়ছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, এসব এলাকায় বসতবাড়ির পানিতে ই. কোলাই দূষণ, হাসপাতাল ও ক্লিনিকে অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যবিধি পালনে লিঙ্গ বৈষম্য এবং অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে সচেতনতার অভাব—সব মিলিয়ে এএমআর বিস্তারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
মঙ্গলবার (২৯ জুলাই) ঢাকার একটি হোটেলে ওয়াটারএইড বাংলাদেশের আয়োজনে ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়্যাল রেজিস্ট্যান্সের ওপর পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির প্রভাব এবং উদ্ভাবনী ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিরোধের কৌশল’ শীর্ষক এক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

অনুষ্ঠানে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা, উন্নয়ন সহযোগী, দাতা সংস্থা, বেসরকারি সংগঠন, গণমাধ্যম এবং স্বাস্থ্য ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করা নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তারা দীর্ঘদিন ধরে ‘ওয়ান হেলথ’ পদ্ধতি ও এএমআর নিয়ে কাজ করে আসছেন।
গবেষণায় উঠে এসেছে—নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির অভাব সরাসরি এএমআর বিস্তারের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশেষ করে শহরের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই ঝুঁকি বেশি। এই বাস্তবতায় জনসচেতনতা বাড়াতে জনপ্রিয় ব্যক্তিদের অংশগ্রহণে ভিডিও কনটেন্ট তৈরি করা হয়েছে, যেখানে স্বাস্থ্যবিধি, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সায়দেুর রহমান এএমআরকে বড় হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, দেশের স্বাস্থ্য খাতে ইতিবাচক পরিবর্তনের পাশাপাশি এখন থেকে এএমআরকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সচেতন করতে স্কুল পাঠ্যক্রমে হাত ধোয়া ও এএমআর বিষয়ে বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশে ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি ডা. রাজেশ নারওয়াল বলেন, “জীবন রক্ষাকারী অ্যান্টিবায়োটিকগুলো দিন দিন অকার্যকর হয়ে পড়ছে—এটি এক নীরব মহামারি।” তিনি আরও বলেন, এএমআর মোকাবিলায় তথ্যভিত্তিক পদক্ষেপের পাশাপাশি পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি একটি কার্যকর ও সহজ উপায়, যা অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।
রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন বলেন, এএমআর একটি দুষ্টচক্রের মতো, যা শুধু মানুষের মধ্যেই নয়—প্রাণী ও পরিবেশেও ছড়িয়ে পড়ছে। এ সমস্যা মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন ওয়াটারএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর হাসিন জাহান। তিনি বলেন, এএমআর মোকাবিলায় দ্বিমুখী কৌশল প্রয়োজন—একদিকে পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধ, অন্যদিকে সংক্রমণ বিস্তার রোধ। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন, কোর্স অসম্পূর্ণ রাখা এবং অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সবশেষে আলোচনায় উঠে আসে—এএমআর মোকাবিলায় শুধু স্বাস্থ্য খাত নয়, পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি খাতের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগই হতে পারে টেকসই সমাধান। সচেতনতা বৃদ্ধি, নীতিনির্ধারণী পদক্ষেপ এবং সমন্বিত কার্যক্রম এখন সময়ের দাবি।
Leave a Reply