হরিদাস পাল, বিশেষ সংবাদদাতা
জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে বিটিভি নিউজ চ্যানেলের যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, এক বছর না যেতেই তা মুখ থুবরে পড়েছে।ফাসিবাদের সহযোগীদের নিয়ন্ত্রণে তুলে দেয়া হয়েছে অনেক সম্ভাবনা নিয়ে যাত্রা শুরু করা রাষ্ট্রীয় এ সংবাদ চ্যানেলটিকে।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ আগ্রহ ও নির্দেশনায় ২০২৪ সনের ৩১ ডিসেম্বর বিটিভি নিউজ চ্যানেলের সম্প্রচার শুরু হয়। নানা সীমাবদ্ধতা স্বত্বেও অল্পদিনেই চ্যানেলটি প্রশংসা কুড়াতে সক্ষম হয়।কিন্তু সম্প্রতি সুক্ষ্ম কৌশলে আওয়ামী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর চ্যানেলটির কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে।
সূত্র বলছে, বর্তমানে কর্মরত বিটিভি নিউজের নিজস্ব ২০জন সংবাদ কর্মকর্তার মধ্যে ৪ জন বিএনপি আমলে এবং বাকিরা সবাই আওয়ামী লীগ এবং কয়েকজন ফখরুদ্দিন-মইনউদ্দিন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে নিয়োপ্রাপ্ত।
বর্তমানে সংবাদ সংগ্রহ ও তৈরির মূল চালিকা শক্তি রিপোর্টার হিসেবে যারা কাজ করছেন তাদের মধ্যে ৩১জন-ই আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োজনপ্রাপ্ত। আওয়ামী আমলের এই রিপোর্টাররা নিজেদেরকে ছাত্রলীগ পরিচয় দিলেও এখন কেউ নিজেদেরকে ছাত্রদল কর্মী এবং কেউ নিজেকে শিবির কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন। তারা বিএনপি ও জামাতের মধ্যে শক্ত কানেকশন তৈরির চেষ্টা করে যাচ্ছেন। অথচ ছাত্রজীবনে এদের প্রায় সবাই ছিলেন ছাত্রলীগ কর্মী।
আওয়ামীপন্থী এই রিপোর্টারদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তথ্য মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিবের আত্মীয় পরিচয় দেওয়া এক রিপোর্টার। এই রিপোর্টারের বিরুদ্ধে নানা ধরনের প্রতারণা ও নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগ রয়েছে। তা সত্ত্বেও তার আত্মীয় নারী যুগ্ম সচিবের চাপে সম্প্রতি বিশেষ ব্যবস্থায় এই রিপোর্টারের সম্মানী বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
বিটিভি নিউজ চ্যানেলটি আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর সময় বার্তা প্রধান ছিলেন বিএনপি আমলে নিয়োগ পাওয়া বিটিভির একজন নিজস্ব সংবাদ কর্মী। তার সময়ে বাপকভাবে জুলাই চেতনায় এবং ফাসিবাদ বিরোধী কনটেন্ট প্রচারিত হয়। কিন্তু মন্ত্রণালয় ও বিটিভির ভেতরের আওয়ামী শক্তি তা মেনে নিতে পারেনি।
উল্টো তাকেই ফাসিবাদী আখ্যা দিয়ে ভিত্তিহীন অপপ্রচার চালাতে থাকে। প্রেস ক্লাবের সামনে ভাড়াটে লোক দিয়ে মানববন্ধন ও অনলাইন মিডিয়ায় তার বিরুদ্ধে চালানো হয় ব্যপক অপপ্রচার। ফ্রন্টলাইন থেকে এই অপপ্রচার চালানোর কাজটি করেন ৫ই আগস্ট পরবর্তীতে বিটিভি থেকে বাদপড়া ফাসিবাদী কয়েকজন রিপোর্টার, মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে যাদের এখনো ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে।
তথ্য বলছে, ধুমাত্র অপপ্রচারের উপর ভিত্তি করে কোনো রকম যাচাই না করেই এবং বিটিভি কর্তৃপক্ষের আপত্তি উপেক্ষা করে চার মাস আগে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় তাঁকে বিটিভি নিউজ চ্যানেল থেকে সরিয়ে দেয়। তাঁকে বদলির পরই আওয়ামীপন্থী সংবাদকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় বিটিভি নিউজ। প্রধান বার্তা সম্পাদক পদে বসানো হয় একসময়ে শেখ হাসিনার প্রেস উইং এ কাজ করা বাংলাদেশ বেতারের একজন কর্মকর্তাকে, যার টিভি নিউজ চ্যানেল পরিচালনা তো দূরের কথা, টেলিভিশন মিডিয়ায় কাজ করার কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। ফলে যে অঙ্গীকার এবং সম্ভাবনা নিয়ে বিটিভি নিউজ চ্যানেলের অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছিল তা মুখ থুবরে পড়েছে।
এদিকে, চ্যানেলটিতে আওয়ামীপন্থিদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করতে ৫ই আগস্ট পরবর্তীতে পালিয়ে যাওয়া ফাসিবাদী রিপোর্টারদের পুনর্বহালের উদ্যোগ নিতে মন্ত্রণালয় ও বিটিভির আওয়ামী চক্রের পাঁয়তারা অব্যাহত রয়েছে। এক সপ্তাহ আগে একজনকে পুনর্বহালও করা হয়েছে। বাদ পড়া আরও অন্তত ৬ জন রিপোর্টারকে নির্বাচনের আগেই ফেরত আনার জন্য মন্ত্রণালয় থেকে বিটিভি কর্তৃপক্ষকে মৌখিক চাপ রয়েছে বলে জানা গেছে।
Leave a Reply