চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিংপিং সোমবার (৮ জুন) দুই দিনের সফরে উত্তর কোরিয়া যাচ্ছেন। প্রায় সাত বছর পর এটি তার প্রথম উত্তর কোরিয়া সফর। বেইজিং ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে সম্পর্ক নতুন করে জোরদার করাই এই সফরের অন্যতম লক্ষ্য বলে মনে করা হচ্ছে। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সফরে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উনের সঙ্গে পিয়ংইয়ংয়ে বৈঠক করবেন শি। উত্তর কোরিয়া চীনের একমাত্র আনুষ্ঠানিক চুক্তিভিত্তিক মিত্র হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের সম্পর্ক কিছুটা শীতল হয়ে পড়ে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় বাণিজ্য প্রায় স্থবির হয়ে যায় এবং একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে।
চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরের ৬৫তম বার্ষিকীর আগে শির এ সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই চুক্তিটিই এখনো অন্য কোনো দেশের সঙ্গে চীনের একমাত্র প্রতিরক্ষা চুক্তি।
১৯৫০-এর দশকের শুরুতে কোরীয় যুদ্ধে চীন ও উত্তর কোরিয়ার সেনারা দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে একসঙ্গে যুদ্ধ করেছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার সামরিক সহযোগিতা আরও গভীর হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষে লড়তে উত্তর কোরিয়া ১০ হাজারের বেশি সেনা পাঠিয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া ২০২৪ সালে মস্কো ও পিয়ংইয়ং পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে।
জন ডেলুরি বলেন, “উত্তর কোরিয়ার প্রচারণায় রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে গড়ে ওঠা সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়। কিন্তু চীনের সঙ্গে সম্পর্কের বর্ণনায় মূলত অতীত স্মৃতির আবেগই বেশি দেখা যায়।”
তিনি আরও বলেন, “চীন চায় না যে রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক তাদের সঙ্গে সম্পর্কের চেয়ে অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠুক।”
গত বছরের সেপ্টেম্বরে বেইজিংয়ে আয়োজিত এক বিশাল সামরিক কুচকাওয়াজে শি জিনপিং, কিম জং-উন ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন পাশাপাশি দাঁড়িয়েছিলেন। সেই আয়োজনকে নতুন এক কর্তৃত্ববাদী বিশ্বব্যবস্থার নেতাদের শক্তির প্রদর্শন হিসেবে দেখা হয়েছিল। তবে পর্দার আড়ালে প্রত্যেক নেতা নিজ নিজ জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছেন।
রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার তুলনায় চীন এখনও অন্তত বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী।
শির এ সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন এক মাসও হয়নি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড টাম্প বেইজিং সফর করে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক পুনরায় স্থিতিশীল করার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন। যদিও ওই বৈঠকে উল্লেখযোগ্য কোনো চুক্তি হয়নি, পরে ট্রাম্প জানান, তিনি শি জিনপিংয়ের সঙ্গে উত্তর কোরিয়া প্রসঙ্গেও আলোচনা করেছেন।
এ নিয়ে জল্পনা রয়েছে যে ট্রাম্প হয়তো শির মাধ্যমে কিম জং-উনের কাছে কোনো বার্তা পৌঁছে দিতে চেয়েছেন। ট্রাম্প একাধিকবার বলেছেন, তিনি আবারও উত্তর কোরিয়ার নেতার সঙ্গে বৈঠক করতে আগ্রহী।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানেও পরিবর্তন এসেছে। গত বছর বেইজিংয়ে শি ও কিমের বৈঠকের সরকারি বিবৃতিতে প্রথমবারের মতো কোরীয় উপদ্বীপের পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়নি। যদিও মে মাসে ট্রাম্প ও শির বৈঠকের পর হোয়াইট হাউস দাবি করেছিল, দুই নেতা উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার যৌথ লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তবে বেইজিং এ বক্তব্যের সত্যতা নিশ্চিত করেনি।
রবিবার দেশটির ক্ষমতার কেন্দ্রের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি কিম জং-উনের বোন কিম ইয়ো-জং দাবি করেন, শি ও ট্রাম্পের মধ্যে উত্তর কোরিয়ার নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে আলোচনা হয়েছে— এ ধরনের খবর ‘মিথ্যা’।
গত সপ্তাহে উত্তর কোরিয়া নতুন একটি পারমাণবিক উপাদান উৎপাদন কারখানার উদ্বোধন করে। এ সময় কিম জং-উন দেশের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার ‘সূচকীয় হারে’ বাড়ানোর আহ্বান জানান।
বিশ্লেষকদের মতে, শি জিনপিংয়ের কাছে পারমাণবিক আলোচনার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উত্তর-পূর্ব এশিয়ায় চীনের নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষা করা, বিশেষ করে জাপানকে ঘিরে তাদের উদ্বেগ।
ধারণা করা হয়, জাপানের ক্রমবর্ধমান সামরিক সক্ষমতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে শি জিনপিং ট্রাম্প এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে কথোপকথনে বেশ সরব ছিলেন। যদিও জাপান এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তাদের সক্রিয় প্রতিরক্ষা নীতি কোনোভাবেই ‘নতুন সামরিকবাদ’-এর প্রতিফলন নয়।
জন ডেলুরি মনে করেন, জাপানকে কেন্দ্র করে চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে সহযোগিতা বাস্তবের চেয়ে কূটনৈতিক বক্তব্যেই বেশি সীমাবদ্ধ থাকবে।
এ সফরের আরেকটি তাৎপর্য হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শি জিনপিং বিদেশ সফর কমিয়ে দিয়েছেন। তিনি বরং বিশ্বনেতাদের বেইজিংয়ে আমন্ত্রণ জানাতেই বেশি আগ্রহী ছিলেন। ফলে উত্তর কোরিয়া সফরে তার সম্মতি চীন-উত্তর কোরিয়া সম্পর্কের গুরুত্বকেই তুলে ধরে।
উইলিয়াম ইয়াং বলেন, “উত্তর কোরিয়ার সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নিয়ন্ত্রিত ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার ঘোষণার পর শি সম্ভবত মনে করছেন, কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনা যাতে আরও না বাড়ে, সে জন্য তার ব্যক্তিগতভাবে পিয়ংইয়ং যাওয়া প্রয়োজন।”
জন ডেলুরির ভাষায়, শি জিনপিংয়ের প্রধান লক্ষ্য হলো, “উত্তর কোরিয়াকে যেন চীনের প্রভাববলয়ের বাইরে খুব বেশি দূরে সরে যেতে না দেওয়া—যা নিয়ে বেইজিং সব সময়ই উদ্বিগ্ন থাকে।”
Leave a Reply