চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনাল তার পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছেন, আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ডই জুলাই-আগস্টের ঘটনাপ্রবাহে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রথম ধাপ (ফার্স্ট স্টেপ) হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে।
এদিকে ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, আবু সাঈদ হত্যা মামলা ছাড়াও ট্রাইব্যুনাল-১ ও ট্রাইব্যুনাল-২-এ বিচারাধীন আরও তিনটি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় চলতি মাসেই প্রকাশ পেতে পারে।
ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন সূত্রে জানা গেছে, গত ১১ জুন ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারপতিদের স্বাক্ষরিত পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে জমা দেয়া হয়েছে। বর্তমানে রায়ের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে দেখা হচ্ছে, কোনো সাজা বা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন আপিল করবে কি না।
গত ৯ এপ্রিল ঘোষণা করা সংক্ষিপ্ত রায়ের পর প্রকাশিত এই পূর্ণাঙ্গ রায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের আইনি কাঠামো, ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার, আন্তর্জাতিক আইন এবং সাক্ষ্যপ্রমাণের মূল্যায়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। রায়ে ব্যক্তিগত ফৌজদারি দায়, কমান্ড রেসপনসিবিলিটি, বেসামরিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ওয়াইডস্প্রেড ও সিস্টেমেটিক অ্যাটাক এবং রোম স্ট্যাটিউটসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন নজির বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।
রংপুর তাজহাট থানার এই মামলার বিচার চলাকালে মূল প্রশ্ন ছিল–আবু সাঈদের মৃত্যু কি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি এটি বৃহত্তর মানবতাবিরোধী অপরাধের অংশ? দীর্ঘ রায়ে সেই প্রশ্নের বিশদ আইনি বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন আদালত।
একটি প্রাচীন চীনা প্রবাদ–‘Every thousand miles has its first step’ উদ্ধৃত করে ট্রাইব্যুনাল রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেন, ‘শত্রুর জন্যও ইনসাফ’ প্রতিষ্ঠার নীতির ওপর ভিত্তি করে এই রায়ের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। এ ছাড়া ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের আইনে অনুপস্থিত আসামির বিচারের (ট্রায়াল ইন অ্যাবসেন্সিয়া) যে সুযোগ রাখা হয়েছে, রায়ে তারও বিস্তর ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে।
রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, মামলাটির বিচারপ্রক্রিয়ায় ২৫ জন সাক্ষীর জবানবন্দি, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ভিডিও ফুটেজ এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদপত্রে প্রকাশিত ৪১টি প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হয়েছে। প্রত্যেক আসামির বিরুদ্ধে আলাদাভাবে সাক্ষ্য ও প্রমাণ বিশ্লেষণ করে তাদের ভূমিকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আদালতের মতে, বিচারপ্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হয়েছে।
এর আগে, গত ৯ এপ্রিল এ মামলার রায় ঘোষণা করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল। রায়ে দুজনকে মৃত্যুদণ্ড, তিনজনকে যাবজ্জীবন, পাঁচজনকে ১০ বছর, আটজনকে ৫ বছর ও ১১ জনকে ৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একইসঙ্গে একজনের হাজতবাসকে সাজার মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে বলে গণ্য করা হয়।
Leave a Reply