অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ব্যাপক সংস্কার, স্বচ্ছ নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা এবং অতীতে সংঘটিত বড় ধরনের বাজার কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে দেশের পুঁজিবাজারে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধীরে ধীরে ফিরে আসছে।
রবিবার (১২ জুলাই) জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের সদস্য মো. কামরুল হাসান (ময়মনসিংহ-৬)-এর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী জানান, পুনর্গঠিত বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ইতোমধ্যে দৃশ্যমান ফল দিতে শুরু করেছে। গত দুই মাস ধরে শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বজায় রয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘শেয়ারবাজার এখন ঊর্ধ্বমুখী এবং সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর গত দুই মাসে বাজারের পারফরম্যান্স আরও শক্তিশালী হয়েছে। এটি পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও জনগণের আস্থা ফিরে আসারই প্রতিফলন।’
তিনি জানান, সরকার একজন চেয়ারম্যান ও তিনজন কমিশনার নিয়ে নতুন বিএসইসি গঠন করেছে। আরও একজন কমিশনার নিয়োগের প্রক্রিয়া চলমান।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান কমিশনের কোনো সদস্য রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাননি। ‘নিয়োগ প্রক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ স্বচ্ছ। অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমিও ব্যক্তিগতভাবে তাদের কাউকে আগে চিনতাম না,’ বলেন তিনি।
নতুন কমিশনের সদস্যরা অভিজ্ঞ পেশাজীবী উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশি-বিদেশি পুঁজিবাজার সম্পর্কে তাদের ব্যাপক অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাদের সততা, দক্ষতা ও নিষ্ঠা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই।
পূর্ববর্তী সরকারের আমলে সংঘটিত বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, অনিয়ম ও কারসাজির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
তিনি জানান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে গৃহীত শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিস্তারিত তথ্য বিএসইসির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বাজার কারসাজি, প্রতারণা ও বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিএসইসি আর্থিক জরিমানা আরোপ করেছে। বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড (বেক্সিমকো)-এর শেয়ার লেনদেনে কারসাজির ঘটনায়ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জরিমানা করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, বাজার কারসাজি, দুর্নীতি ও অন্যান্য আর্থিক অনিয়মে জড়িতদের চিহ্নিত করতে গঠিত তদন্ত ও অনুসন্ধান কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কমিশন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।
অর্থমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, সরকারের চলমান সংস্কার কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও আন্তর্জাতিক মানের বিনিয়োগ গন্তব্যে পরিণত হবে।
তিনি বলেন, ‘শুধু স্থানীয় বিনিয়োগকারীরাই নন, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আস্থাও বাজারে ফিরছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক তহবিল ব্যবস্থাপকরা আবারও বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন।’
তিনি জানান, হংকং, লন্ডন ও নিউইয়র্কসহ বিশ্বের প্রধান আর্থিক কেন্দ্রগুলোর বিনিয়োগ ব্যবস্থাপকরা ইতোমধ্যে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের সম্ভাবনা যাচাই করতে সফর শুরু করেছেন। তাদের আগ্রহ দেশের বাজারের প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থা বৃদ্ধির ইঙ্গিত বহন করে।
অপর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার করব্যবস্থাকে সহজ, ন্যায়সংগত ও করদাতাবান্ধব করার পাশাপাশি করজাল উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সমন্বিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।
তিনি জানান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিভিন্ন খাতে কার্যরত প্রতিষ্ঠানের বাজার অংশীদারিত্ব নির্ধারণ করছে, যাতে প্রকৃত ব্যবসায়িক অবস্থানের ভিত্তিতে ন্যায্য ও আনুপাতিক হারে কর নির্ধারণ করা যায়।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের বাজার অংশীদারিত্ব নির্ধারণ করা হচ্ছে, কারণ করের দায় তাদের ব্যবসার আকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। অতীতে এটি যথাযথভাবে করা হয়নি। এখন আমরা আরও যৌক্তিক ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা গড়ে তুলছি।’
তিনি আরও জানান, করজালের বাইরে থাকা ব্যক্তি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আনুষ্ঠানিক করব্যবস্থার আওতায় আনতে সরকার সহজীকৃত ফ্ল্যাট-রেট কর ব্যবস্থা চালু করছে।
প্রস্তাবিত এ ব্যবস্থায় করদাতার আর্থিক সক্ষমতা অনুযায়ী এলাকা-ভিত্তিক নির্দিষ্ট হারে কর নির্ধারণ করা হবে। এতে জটিল আয়কর রিটার্ন দাখিল বা দীর্ঘ মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হবে না।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘মানুষ নির্ধারিত ফ্ল্যাট-রেট কর পরিশোধ করে একটি রসিদ গ্রহণ করবে। তাদের আয়কর রিটার্ন পূরণ করতে হবে না এবং কর কর্মকর্তাদের অপ্রয়োজনীয় হয়রানিরও শিকার হতে হবে না।’
তিনি বলেন, নতুন করদাতাদের আনুষ্ঠানিক করব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং স্বেচ্ছায় কর পরিশোধে উৎসাহিত করাই এই সহজীকৃত ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমাদের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য হলো সহজ ফ্ল্যাট-রেট ব্যবস্থার মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক নতুন করদাতাকে করজালের আওতায় আনা। করভিত্তি পর্যাপ্ত সম্প্রসারিত হলে পরবর্তীতে বিদ্যমান কর আইন অনুযায়ী ধাপে ধাপে নিয়মিত করব্যবস্থা কার্যকর করা হবে।’
Leave a Reply