মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা ও ইরানের সংঘাত যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই বদলে যাচ্ছে যুদ্ধের ধরন। ইরানের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি মার্কিন ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, হতাহত হয়েছে মার্কিন সেনারাও। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার কৌশল বদলে সেনাদের একটি অংশকে সামরিক ঘাঁটির বাইরে হোটেল ও অন্যান্য বেসামরিক স্থাপনায় সরিয়ে নেয়ার খবর সামনে এসেছে। আর মার্কিন এই কূটকৌশল নিয়েই শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। প্রশ্ন উঠছে— কেন নিজেদের গা বাঁচাতে সাধারণ মানুষকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে মার্কিনিরা? এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইন কি বলছে?
এক সময় মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে মনে করা হতো প্রায় দুর্ভেদ্য দুর্গ। কিন্তু একের পর এক ইরানের ক্ষেপনাস্ত্র আর ড্রোন হামলায় সেই নিরাপত্তা বলয়ে এখন ফাটল স্পষ্ট। হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিতে সমঝোতা চুক্তি ভঙ্গ করে চলমান মার্কিন আগ্রাসণের জবাবে কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডানের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে তান্ডব চালাচ্ছে ইরান।
ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর হামলায় বাড়ছে মার্কিন সেনা নিহতের সংখ্যা। এমন অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সাধারণ মানুষকে ঢাল হিসেবে ব্যবহারের অপকৌশল নিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। সাধারণ মানুষের জীবনের ঝুঁকি তৈরি করে বেসামরিক অফিস, হোটেল ও স্থাপনায় অবস্থা করছে মার্কিন সেনারা অভিযোগ তেহরানের। বেসামরিক স্থাপনায় অবস্থান নিয়ে কী যুদ্ধাপরাধ করছে আমেরিকা, কী বলছে যুদ্ধের আইন?
সমঝোতা চুক্তি ভেঙে টানা ১১ দিন ধরে আবারো চলছে আমেরিকা- ইরান যুদ্ধ। এবার আরো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে সফল আঘাত চালাচ্ছে ইরান। ইরানের হামলায় তছনছ হয়েছে কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডানের একাধিক ঘাঁটি এবং এর ভেতরে থাকা যুদ্ধবিমান, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাসহ রাডার সিস্টেম।বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষয়ক্ষতি ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে কিছু মার্কিন সদস্যকে সামরিক ঘাঁটি থেকে সরিয়ে হোটেল, অফিস ভবন এবং অন্যান্য বেসামরিক স্থাপনায় রাখা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের নজর এড়িয়ে সেনাদের রক্ষায় এই কৌশল নেয়া হয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক সদস্যদের বেসামরিক স্থাপনায় অবস্থান করানো হলে সেই ভবনগুলো ও সাধারণ মানুষ হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। মূলত আমেরিকা সাধারণ মানুষকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে আর চাইছে ইরান এসব স্থাপনায় হামলা চালিয়ে তাদের ফাঁদে পা দিয়ে যুদ্ধাপরাধ করুক। এমনকি তেহরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বেশ কিছু অবস্থান শনাক্তের কথাও বলা হয়েছে।
যুদ্ধের আইন অনুযায়ী সাধারণ মানুষকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা মারাত্নক অপরাধ। জেনেভা কনভেনশনের অতিরিক্ত প্রোটোকল–১ এর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সামরিক লক্ষ্যকে সুরক্ষিত রাখতে বেসামরিক মানুষের উপস্থিতি বা বেসামরিক স্থাপনাকে ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। এছাড়া রোম সংবিধির ৮ ধারা অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক মানুষকে সামরিক অভিযানের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এক্ষেত্রে মার্কিন সেনাদের অবস্থান করা বেসামরিক স্থাপনাতে হামলা বা অভিযান পরিচালনার পূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে ইরানের হাতে। তবে সংযম প্রকাশ করে যাচ্ছে ইরান। সরাসরি এসব স্থাপনায় হামলা না চালিয়ে কুয়েতের বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও পানি শোধানাগারের মতো কৌশলগত স্থানে হামলা চালিয়েছে আইআরজিসি।
তবে তেহরান সবসময়ই বলেছে, তাদের লক্ষ্য বেসামরিক মানুষ নয়; বরং যেসব স্থাপনা থেকে আমেরিকা সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে বা যেখানে মার্কিন সেনাদের উপস্থিতি রয়েছে, সেগুলোই তাদের লক্ষ্য। তারা সতর্ক করে বলেছে, মার্কিন বাহিনী যদি বেসামরিক স্থাপনাকে সামরিক কাজে ব্যবহার করে, তাহলে সেই স্থানগুলোও বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। একই সাথে উপসাগরীয় দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতায় সহায়তা না করার আহ্বানও জানিয়েছে তেহরান।
Leave a Reply