তিব্বত সীমান্তবর্তী নেপালের পার্বত্য অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে বিপর্যস্ত জনজীবন। দিন যত গড়াচ্ছে, ততই বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার সর্বশেষ হিসাবে, বন্যায় এখন পর্যন্ত ৯৮৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এখনও নিখোঁজ রয়েছেন ৩ হাজার ৯১৬ জন। তাদের মধ্যে ৬০০ জনের বেশি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মী, যাদের একটি অংশ কাদামাটি ও ধ্বংসস্তূপে ভরা ভূগর্ভস্থ টানেলে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উদ্ধারকারীরা দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছে নিখোঁজদের সন্ধানে অভিযান চালাচ্ছেন। বিশেষ করে ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর ভূগর্ভস্থ টানেলগুলোতে আটকে থাকা কর্মীদের উদ্ধারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। টানেলের ভেতরে বাতাস সরবরাহ করতে পাম্প ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর ও ধ্বংসস্তূপের কারণে উদ্ধারকারীদের এগোতে হচ্ছে অত্যন্ত ধীরগতিতে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ জানিয়েছেন, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর এলাকা থেকে এ পর্যন্ত ২৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার অভিযানে নেপাল ও চীনের সামরিক সদস্যদের পাশাপাশি ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার বিশেষজ্ঞরাও সহায়তা করছেন। নিখোঁজদের স্বজনদের অপেক্ষা যেন শেষই হচ্ছে না। ৩৩ বছর বয়সী প্রকৌশলী অরুস ভান্ডারী একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত অবস্থায় নিখোঁজ হন। তার স্ত্রী অনুশিলা ভান্ডারী বিবিসি নেপালিকে বলেন, ‘আমি চাই আমরা তাকে খুঁজে পাই। আমি চাই সে বাড়ি ফিরে আসুক।’
আরেক নিখোঁজ কর্মীর স্ত্রী সীতা পান্ডে এখনও স্বামীর ফিরে আসার আশায় বুক বেঁধে আছেন। নেপালের দৈনিক কান্টিপুরকে তিনি বলেন, টানেলের ভেতরে অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা থাকায় তিনি এখনও স্বামীর বেঁচে থাকার আশা করছেন।
নিখোঁজদের একজন প্রকৌশলী মিলান খারেল। বন্যার সময় তিনি আপার ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত ছিলেন। তার বোন প্রিয়া খারেল বলেন, প্রকল্প থেকে ফিরে আসা কয়েকজন জানিয়েছেন, টানেলের ভেতরে মানুষ ছিলেন। তাই দ্রুত সেনাবাহিনী সেখানে পৌঁছাতে পারলে তাদের জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব বলে আশা করছেন তিনি। ভূগর্ভস্থ উদ্ধার অভিযানে নেপালি কর্তৃপক্ষকে দূর থেকে সহায়তা করছেন অস্ট্রেলীয় প্রকৌশলী আর্নল্ড ডিক্স। তার ভাষ্য, বন্যার পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পাথর, কাদা ও ধ্বংসস্তূপ এসে পুরো এলাকাটির চেহারা বদলে দিয়েছে।
বিবিসি রেডিও ৪-কে ডিক্স বলেন, টানেলগুলোর অবস্থান শনাক্ত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক জায়গা এমনভাবে ধ্বংস হয়েছে যে সেখানে টানেল বা স্থাপনার কোনো চিহ্নই দেখা যাচ্ছে না। তার ভাষায়, পুরো এলাকা যেন ‘চাঁদের পৃষ্ঠের মতো’ হয়ে গেছে।
উদ্ধারকারীরা জলবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অবস্থান নিশ্চিত করতে পারলে সেখানে পৌঁছানোর উপযুক্ত পথ নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। তবে পথ তৈরি করতে বড় বড় পাথর ও ধ্বংসস্তূপ সরাতে হচ্ছে। কোনো কোনো পাথর এত বড় যে তা একটি বাড়ির চেয়েও বিশাল। তবুও ভূগর্ভস্থ পরিবেশ হয়তো ওপরের ভয়াবহ পানির স্রোত থেকে আটকে থাকা মানুষদের কিছুটা সুরক্ষা দিয়ে থাকতে পারে—এ কারণে নিখোঁজদের জীবিত উদ্ধারের আশা এখনও ছাড়ছেন না বিশেষজ্ঞরা।
বন্যায় নিহতদের মরদেহ শনাক্ত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া প্রায় ৯০০ মরদেহের মাত্র ৪ শতাংশ শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। নদীর নিম্ন অববাহিকায় অবস্থিত চিতওয়ান জেলায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। বন্যার স্রোতে ভেসে আসা প্রায় ৩০০ মরদেহ নদীর তীরে পাওয়া গেছে। পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় সেগুলোর অস্থায়ী দাফন করা হচ্ছে।
মরদেহ শনাক্ত করতে চিকিৎসাকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকেরা ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করছেন। শহরের বাইরে একটি বনাঞ্চলের বড় অংশ খুঁড়ে মরদেহগুলো অস্থায়ীভাবে দাফনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। চিতওয়ানের জেলা প্রধান কর্মকর্তা গণেশ আরিয়াল বলেন, পর্যাপ্ত হিমঘর না থাকায় কর্তৃপক্ষকে এই অস্থায়ী ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে মরদেহ শনাক্ত হওয়ার পর স্বজনেরা চাইলে সেগুলো ফেরত নিতে পারবেন।
জলবিদ্যুৎ নেপালের অর্থনীতি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পাহাড়ি নদীগুলোকে কাজে লাগিয়ে দেশটি দীর্ঘদিন ধরে একের পর এক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তুলছে। কিন্তু এবারের ভয়াবহ বন্যায় অন্তত ১১টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার ধাক্কায় সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ এই দুর্যোগকে ‘সাধারণ কোনো ঘটনা নয়’ বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে হিমালয় অঞ্চলে এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। সোমবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় শাহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগের ঝুঁকি নিয়ে আরও জোরালোভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
এদিকে উদ্ধার অভিযান সপ্তম দিনে গড়ালেও নিখোঁজদের স্বজনদের অপেক্ষা যেন শেষ হচ্ছে না। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে একের পর এক টানেলে প্রবেশের চেষ্টা করছেন উদ্ধারকারীরা। সময় যত যাচ্ছে, ততই বাড়ছে উৎকণ্ঠা—তবু প্রিয়জনকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশায় অপেক্ষা করছেন হাজারো পরিবার।
সূত্র: বিবিসি
Leave a Reply