বিখ্যাত কবি বেগম সুফিয়া কামাল তার ‘পল্লী মায়ের কোল’ কবিতায় লিখেছেন, ‘পৌষ পার্বণে পিঠা খেতে বসি খুশিতে বিষম খেয়ে/আরও উল্লাস বাড়িয়াছে মনে মায়ের বকুনি পেয়ে।’ প্রাচীন বাংলায় মিষ্টান্ন হিসেবে পিঠার প্রচলন অনেক আগে থেকেই। বাংলা ভাষায় লেখা কৃত্তিবাসী রামায়ণ, অন্নদামঙ্গল, ধর্মমঙ্গল, মনসামঙ্গল, চৈতন্য চরিতামৃত ইত্যাদি কাব্য এবং মৈমনসিংহ গীতিকায় কাজল রেখা গল্পকথনে পিঠাপুলির কথা পাওয়া যায়। সে হিসেবে ধারণা করা হয়, আনুমানিক ৫০০ বছর আগেও বাঙালির খাদ্য সংস্কৃতিতে পিঠার জনপ্রিয়তা ছিল।
এই পিঠাপুলি মূলত তৈরি হয় চালের গুঁড়া, ডাল বাটা, গুড়, নারিকেল ইত্যাদির মিশ্রণে। মূল উপাদান কিন্তু বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য ধান থেকেই আসে। অগ্রহায়ণ মাসে নতুন ধান ওঠার পর সেগুলো গোলাবন্দি করা হয়। নবান্নের পর শীত পড়তে শুরু করলে পৌষ মাসে আয়োজন করা হয় এই পিঠা তৈরির উৎসব।
তারপর বসন্তের আগমন পর্যন্ত চলে হরেক রকম পিঠা খাওয়ার ধুম। মূলত মাঘ-ফাল্গুন, এ দুই মাসই জমিয়ে পিঠা খাওয়া হয়।
শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন ভোর বা সন্ধ্যায় মা-দাদিরা চুলার পাশে বসে ব্যস্ত সময় কাটান পিঠা তৈরিতে। আত্মীয়-স্বজন, বিশেষ করে জামাইদের এ সময় দাওয়াত করে পিঠা খাওয়ানো হয়।
খেজুরের রস থেকে গুড়, পায়েস এবং নানা রকম মিষ্টান্ন তৈরি হয় এ সময়ে। খেজুরের রসের মোহনীয় গন্ধে তৈরি পিঠা-পায়েস আরো বেশি মধুময় হয়ে ওঠে।
এ সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় পিঠা হচ্ছে ভাপা পিঠা। এ ছাড়া আছে চিতই পিঠা, দুধচিতই, ছিট পিঠা, দুধকুলি, ক্ষীরকুলি, তিলকুলি, পাটিসাপটা, ফুলঝুড়ি, ধুপি পিঠা, নকশি পিঠা, মালাই পিঠা, মালপোয়া, পাকন পিঠা, ঝাল পিঠা ইত্যাদি। বাংলাদেশে শতাধিক ধরনের পিঠার প্রচলন রয়েছে।
কিছু পিঠা কালের গভীরে হারিয়ে গেলেও এখনো পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। শীতকালে শুধু গ্রাম-বাংলায়ই নয়, শহর এলাকায়ও পিঠা খাওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। ইদানীং শহরেও পাওয়া যায় শীতের পিঠার স্বাদ।
একটা সময় দেশে শত শত নামের ও জাতের ধান ছিল। তেমনি সেসব ধানের পিঠারও অন্ত ছিল না। আর এসব পিঠার ছিল বিচিত্র ধরনের নাম। এসব পিঠা-পায়েসকে নিয়ে গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে এখনো অসংখ্য গান, কবিতা ও ছড়া প্রচলিত আছে। শীতের সকাল ও সন্ধ্যাকে উপভোগ্য করে তোলে এই পিঠা। শীতকালে আমাদের দেশে বিয়ের মৌসুম চলে আর পিঠা হচ্ছে এই বিয়ে উদযাপনের একটি অন্যতম অংশ।
তবে বর্তমানে শুধু শীতেই নয়, সারা বছর পিঠা খাবার সুযোগ রয়েছে। শহরের ব্যস্ত জীবনে পিঠা তৈরি করা বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তাই রাস্তার মোড়ে বা বিভিন্ন পার্কের পাশে বেশ কিছু জায়গায় গড়ে উঠেছে পিঠাঘর। সেখানে পিঠা বিক্রি করা হয়।
পিঠাপুলি আমাদের লোকজ ও নান্দনিক সংস্কৃতিরই প্রকাশ। আমাদের হাজারো সমস্যা সত্ত্বেও গ্রাম-বাংলায় এসব পিঠা-পার্বণের আনন্দ-উদ্দীপনা এখনো মুছে যায়নি। পিঠা-পার্বণের এ আনন্দ ও ঐতিহ্য যুগ যুগ টিকে থাকুক বাংলার ঘরে ঘরে।
Leave a Reply