দৈনন্দিন জীবনের চরম ব্যস্ততা আর কাজের চাপে আমরা প্রায়ই মানসিক ও শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত বোধ করি। এই মানসিক চাপ বা ‘স্ট্রেস’ কাটাতে অনেকেই ধ্যান (মেডিটেশন) কিংবা ব্যায়ামের আশ্রয় নেন, যা অনেক সময়সাপেক্ষ।
তবে সম্প্রতি চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও গবেষকরা বলছেন, ক্লান্তি ও দুশ্চিন্তা দূর করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় দেওয়ার প্রয়োজন নেই। মাত্র ২০ থেকে ৩০ সেকেন্ডের ছোট ছোট কিছু সচেতন অনুশীলন বা ‘মাইক্রোপ্র্যাকটিস’-ই আপনার মন ভালো করে মেজাজ চাঙ্গা করে তুলতে পারে।
‘মাইক্রোপ্র্যাকটিস’ বইয়ের লেখক ইলাই সুসমান এবং নেদারল্যান্ডসের ডেলফট ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির গবেষক ন্যাটালি ভ্যান ডার ওয়ালের মতে, কাজের ফাঁকে নেওয়া ছোট ছোট বিরতি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
মানসিক স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষমতা বাড়াতে গবেষকদের প্রস্তাবিত কয়েকটি সহজ ‘মাইক্রোপ্র্যাকটিস’:
১. লাফটার ইয়োগা (হাসির ব্যায়াম)
কোনো কৌতুক বা হাসির কারণ ছাড়াই কৃত্রিমভাবে হাসার চেষ্টা করাকে বলা হয় ‘লাফটার ইয়োগা’।
গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো কারণ ছাড়া অবলীলভাবে হাসার এই চর্চা দুশ্চিন্তা ও বিষণ্নতা কমাতে সাধারণ কৌতুক শুনে হাসার চেয়ে দ্বিগুণ কার্যকরী।
পদ্ধতি : হাত পেটে রেখে তিনটি দীর্ঘ শ্বাস নিন। এরপর জোর করে ‘হি হি হি, হা হা হা’ শব্দ করে হাসতে শুরু করুন। কিছুক্ষণ পর এই কৃত্রিম হাসিই সত্যি হাসিতে রূপ নেবে।
২. মাইক্রো ইয়োগা (এক মুহূর্তের স্ট্রেচিং)
যারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কম্পিউটারের পর্দার সামনে বসে কাজ করেন, তাদের ঘাড় ও পিঠের টান ভাব কমাতে এই অনুশীলন আদর্শ। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১৫ মিনিটে মাত্র ১৫ থেকে ৩০ সেকেন্ডের জন্য শরীর প্রসারিত (স্ট্রেচ) করলে কাজের উৎপাদনশীলতা প্রায় ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
পদ্ধতি : পিঠের পেছনে হাতের আঙুলগুলো একটির ভেতর আরেকটি আটকে নিন। শ্বাস নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাত নিচের দিকে টান টান করে বুক ওপরের দিকে তুলুন। ২-৩টি গভীর শ্বাস নিয়ে শরীর শিথিল করুন।
৩. ধীরগতির গভীর শ্বাস (স্লো ব্রেথস)
গভীর ও ধীরগতির শ্বাসপ্রশ্বাস শরীরের স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করে। নেপলসের গবেষক অমিত কুমার জানান, ৩টি দীর্ঘ শ্বাস মস্তিষ্কে অ্যালফা ও থিটা তরঙ্গ বাড়িয়ে দেয়, যা মনকে শান্ত ও গভীর মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে।
পদ্ধতি : আরামে বসুন এবং চোখ বন্ধ করুন। প্রতিটি শ্বাস নিতে ও ছাড়তে অন্তত ১০ সেকেন্ড সময় নিন। ফুসফুসে বাতাস প্রবেশের অনুভূতির দিকে নজর দিন।
৪. নিজের প্রতি স্পর্শ ও সহানুভূতি (সেলফ-কমপ্যাশনেট টাচ)
একাকীত্ব ও মানসিক চাপ কমাতে মাত্র ২০ সেকেন্ডের আত্ম-স্পর্শ দারুণ কাজ করে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, নিজের শরীরের প্রতি সহানুভূতির স্পর্শ দিলে শরীরে স্ট্রেস হরমোন বা ‘করটিসল’-এর মাত্রা দ্রুত কমে যায়।
পদ্ধতি : বুকের ওপর বা বাহুতে হাত রাখুন। হাতের উত্তাপ অনুভব করে নিজের সম্পর্কে ইতিবাচক ও ভালোবাসাপূর্ণ চিন্তা করুন।
গবেষকদের পরামর্শ, মানসিক চাপমুক্ত থাকতে সব কৌশল একসঙ্গে চর্চা করার প্রয়োজন নেই। দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে মানানসই যেকোনো একটি বা দুটি অভ্যাস বেছে নিলেই দীর্ঘ মেয়াদে মিলবে মানসিক প্রশান্তি।
Leave a Reply