কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া প্রদেশে ভয়াবহ দাবানল নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় জরুরি সহায়তা নিয়ে এগিয়ে এসেছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়া এসব দাবানলে এখন পর্যন্ত একজনের মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি প্রাণ বাঁচাতে ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটতে বাধ্য হয়েছেন প্রায় ২২ হাজার মানুষ।
বিসি ওয়াইল্ডফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, রোববার প্রদেশজুড়ে ১০২টি দাবানল সক্রিয় ছিল। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেককেই ‘নিয়ন্ত্রণের বাইরে’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গত এক সপ্তাহেই নতুন করে ৭৮টি দাবানলের সূত্রপাত হয়েছে।
কেলোনা শহর থেকে প্রায় ৪৮ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত সামারল্যান্ড শহরের পুরো এলাকা শনিবার দিবাগত রাতে খালি করে দেওয়া হয়। প্রায় ১২ হাজার বাসিন্দার এই শহরের পাশাপাশি কাছের পিচল্যান্ড এলাকার আরও প্রায় ৮ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আরও প্রায় ১০ হাজার মানুষকে যেকোনো মুহূর্তে এলাকা ছাড়ার প্রস্তুতি রাখতে বলা হয়েছে।
ওকানাগান লেকের তীরে অবস্থিত সামারল্যান্ড থেকে পালিয়ে যাওয়া বাসিন্দাদের একজন অ্যানেট বুলে। শনিবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বাড়ি ছাড়ার সময় পুরো এলাকা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ছিল।
পেন্টিকটনের একটি আশ্রয়কেন্দ্রে ওঠা বুলে বলেন, ‘প্রায় কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। চারদিক অন্ধকার ছিল। আর আগুনের শিখায় ঘেরা পাহাড়ের চূড়াটা যেন আমাদের দিকেই এগিয়ে আসছিল।’ তিনি বলেন, ‘ভয়ের সেই অনুভূতি প্রকাশ করার মতো কোনো শব্দ নেই।’
রবিবার (৯ আগস্ট) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে কানাডার জরুরি ব্যবস্থাপনা ও কমিউনিটি রেজিলিয়েন্সমন্ত্রী এলেনর ওলজেভস্কি জানান, ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার জরুরি সহায়তার আবেদন অনুমোদন করা হয়েছে। এর আওতায় বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হওয়া মানুষদের আশ্রয় ও থাকার ব্যবস্থা করা হবে। তিনি বলেন, পাবলিক সেফটি কানাডার গভর্নমেন্ট অপারেশনস সেন্টারের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মকর্তাদের প্রাদেশিক সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এমন মানুষের কাছে দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দেওয়া যায়।
এদিকে বাল্ড রেঞ্জ দাবানল নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। আগুনটি এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে যে তা মোকাবিলা করাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুক্রবার রাতে প্রথম আগুন শনাক্ত হওয়ার পর মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তা ১০০ বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। আয়তনের দিক থেকে যা নিউইয়র্কের ম্যানহাটন দ্বীপের প্রায় দ্বিগুণ। এরই মধ্যে আগুন প্রায় ৯ মাইল এগিয়ে ওকানাগান লেকের দিকে পৌঁছে যায়। শনিবার রাতে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার প্রিমিয়ার ডেভিড এবি প্রদেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আগুনের বিস্তার ছিল ‘যেন একটি বোমা বিস্ফোরিত হয়েছে।’
বিসি ওয়াইল্ডফায়ার সার্ভিসের প্রাদেশিক কার্যক্রমবিষয়ক পরিচালক ক্লিফ চ্যাপম্যান বলেন, পুরো গ্রীষ্মজুড়ে চলা তীব্র গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে এমন ‘বিস্ফোরণধর্মী’ আগুনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা আগে দেখা যায়নি। এ সপ্তাহে বজ্রঝড়ের পূর্বাভাস পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে অনেক বাসিন্দাকে বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে হয়েছে। সামারল্যান্ডের বাসিন্দা জেনিফার পাসকো বলেন, কাছের পাহাড়ে আগুনের শিখা দেখতে পেয়ে তিনি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছাতে শুরু করেন।
তিনি বলেন, ‘সবকিছু এত দ্রুত ঘটেছে। আমরা সমুদ্রসৈকত থেকে বাড়ি ফিরেছিলাম, ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখতে পেলাম। এরপর মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে পুরো আকাশ কালো, ঘন মেঘে ঢেকে গেল।’
ব্রিটিশ কলাম্বিয়া ওয়াইল্ডফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, আগুন নিয়ন্ত্রণে ১০টি সাধারণ হেলিকপ্টার ও একটি নাইট-ভিশন হেলিকপ্টার কাজ করছে।
কানাডার ফেডারেল পুলিশ রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ (আরসিএমপি) জানিয়েছে, ওকানাগান লেক এলাকায় দাবানলের কারণে লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার সময় পালানোর চেষ্টা করতে গিয়ে ৮০ বছর বয়সী এক নারী মারা গেছেন।
ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার কামলুপসে অবস্থিত থম্পসন রিভার্স ইউনিভার্সিটির ওয়াইল্ডল্যান্ড ফায়ারবিষয়ক অধ্যাপক মাইক ফ্ল্যানিগান বলেন, আগুনের এত দ্রুত বিস্তার কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে ক্রমেই বাড়তে থাকা চরম দাবানলেরই লক্ষণ। তিনি বলেন, গত ছয় সপ্তাহে দক্ষিণ ব্রিটিশ কলাম্বিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রশান্ত মহাসাগরীয় উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে প্রায় কোনো বৃষ্টিই হয়নি। ফলে অঞ্চলগুলো ‘একেবারে শুকিয়ে গেছে’। তাঁর ভাষায়, ‘আপনি যখন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হাঁটবেন, শুকনো পাতার মচমচ শব্দ শুনবেন। এ অবস্থায় একটু অসতর্ক হলেই আগুন লেগে যেতে পারে।’
ফ্ল্যানিগান বলেন, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই এসব পরিস্থিতি আরও তীব্র হচ্ছে। তাঁর মতে, আগের তুলনায় এখন আরও বেশি তীব্রতার দাবানল দেখা যাচ্ছে এবং আগুন ছড়িয়ে পড়ার সময় যত কমছে, পরিস্থিতি মোকাবিলা করাও তত কঠিন হয়ে পড়ছে।
তিনি জানান, চলতি দশকের আগে পর্যন্ত কোনো দাবানল জনবসতি থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হিসেবে দেখা হতো না। কিন্তু আগুনের ভয়াবহতা ও গতির কারণে এখন সেই হিসাব আর কার্যকর নয়। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের সব সময় জরুরি প্রয়োজনীয় সামগ্রীসহ একটি প্রস্তুত কিট রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
ফ্ল্যানিগান বলেন, ‘একটি আগুন যদি এক দিনে ৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে, তাহলে আপনার উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত।’ বাল্ড রেঞ্জের আগুন রাতের বেলাতেও কীভাবে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে, সেটিও এই দাবানল থেকে স্পষ্ট হয়েছে বলে জানান তিনি। প্রচলিত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থায় সাধারণত রাত হলে দমকলকর্মীরা কিছুটা বিরতি নিতেন। কারণ রাতে তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় আগুনের তীব্রতাও কমে আসত। কিন্তু এখন আর তা হচ্ছে না।
ফ্ল্যানিগান বলেন, ‘আগুন সন্ধ্যা ও রাতজুড়েও ভয়াবহভাবে জ্বলতে থাকে। আমরা এমন ঘটনা ক্রমেই বেশি দেখতে পাচ্ছি।’ তিনি বলেন, দিনের বেলায় তীব্র খরা এবং দাবানলের বিপুল শক্তি ও আকার আগুনকে এমন গতি দেয়, যা রাতের অন্ধকারেও বজায় থাকে। এ কারণে ব্রিটিশ কলাম্বিয়া ও আলবার্টার অগ্নিনিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলো এখন নাইট-ভিশন হেলিকপ্টার ব্যবহার করে রাতেও দাবানল নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।
সূত্র: গার্ডিয়ান
Leave a Reply